ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিশংসন নোটিশ খারিজ, বিরোধী দল আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে
ভারতে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের অভিশংসন নোটিশ খারিজ, বিরোধী দল আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে

ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিশংসন নোটিশ খারিজ

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে পদচ্যুত করতে সংসদের দুই কক্ষে বিরোধী দলগুলি ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসন নোটিশ দিয়েছিল। তবে, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণন একই দিনে এই দুটি নোটিশ খারিজ করে দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী নেতারা এখন আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার কথা ভাবছেন এবং আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বিরোধী দলগুলির বৈঠক ও সংবাদ সম্মেলন

এই বিষয়টি নিয়ে গতকাল বুধবার কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, আরজেডি, ডিএমকে, আপ, এনসিপি সহ বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতারা নিজেদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। বৈঠকের পর তাঁরা একযোগে সংবাদ সম্মেলন করে জানান, স্পিকার ও চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে এবং সংবিধান অনুযায়ী যা যা করা সম্ভব, তা তাঁরা করবেন। তবে, এখনই সেই রণকৌশল প্রকাশ করছেন না।

সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেস নেতা ও আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি বলেন, "স্পিকার ও চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এখনই তা আমরা বলছি না। সংবিধান অনুযায়ী ও আইনগতভাবে যে যে পথ খোলা আছে, সেই পথেই হাঁটা হবে।" তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ওব্রায়ান, সাগরিকা ঘোষ, আরজেডির মনোজ ঝা, ডিএমকের যোগেশ, আপ–এর সন্দীপ পাঠক, এবং এনসিপির (শারদ) রাজীব ঝা। তাঁরা জানান, এই উদ্যোগ 'ইন্ডিয়া' জোটের হয়ে চলছে এবং সিপিআই, সিপিএম ও এসপিও সহ অন্যান্য দলও এতে সমর্থন দিচ্ছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিশংসন প্রক্রিয়া ও খারিজের কারণ

জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের প্রধান উদ্যোগ তৃণমূল কংগ্রেস নিলেও সব বিরোধী দলই তাতে সায় দিয়েছিল। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের পদ সাংবিধানিক হওয়ায়, তাঁদের কাউকে অপসারণ করতে গেলে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনই একমাত্র উপায়। এই প্রক্রিয়ার জন্য লোকসভায় ১০০ এবং রাজ্যসভায় ৫০ জন সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন। দুই কক্ষে বিরোধী প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিলেন মোট ১৯৩ সদস্য, যার মধ্যে লোকসভার ১৩৩ এবং রাজ্যসভায় ৬০ জন সই করেছিলেন। নিয়মমাফিক এই নোটিশ জমা দেওয়া হলেও, লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান তা খারিজ করে দেন এবং কোথাও এ নিয়ে আলোচনা করতে দেওয়া হয়নি।

নোটিশ খারিজ করার কারণ হিসেবে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা কোনো কারণ দেখাননি। তবে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান জানান, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আনা বিরোধীদের অভিযোগগুলো আদালতের বিবেচনাধীন। এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে সিংভি বলেন, "এসআইআরের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনাধীন হলেও, জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগে অভিশংসন প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে, তা বিবেচনাধীন নয়। দুটি বিষয় এক নয়।" তিনি আরও যোগ করেন, এসআইআর মামলা তিন বছর চলতে পারে, কিন্তু তাই বলে সিইসিকে অপসারণ করা যাবে না কিনা তা বিচার্য।

সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন

সিংভি বলেন, সাংবিধানিক পদে আসীন কাউকে অভিশংসনের ক্ষেত্রে মোট ছয়টি পর্যায় আছে:

  1. প্রথম পর্যায়ে অপসারণ প্রস্তাব গ্রহণ করা।
  2. তারপর অভিযোগ তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করা।
  3. অভিযোগ গঠন করা।
  4. তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া।
  5. সংসদে বিতর্ক করা।
  6. শেষে রাষ্ট্রপতির নির্দেশ দেওয়া।

শুরুতেই অপসারণ প্রস্তাব খারিজ করার ফলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে লঘু করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। "অধ্যক্ষরাই বিচারক হয়ে গেলেন, যা গণতন্ত্রের জন্য হত্যাসম।"

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি

ভারতের কোনো মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে এর আগে অভিশংসন প্রস্তাব জমা পড়েনি, তাই জ্ঞানেশ কুমার এই দিক থেকে ব্যতিক্রমী। বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে শাসক বিজেপির অন্ধ অনুগত ও আজ্ঞাবহ হওয়ার অভিযোগ এনে অভিশংসন প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। দুই কক্ষের অধ্যক্ষদের সিদ্ধান্ত এমন সময়ে গ্রহণ করা হয়েছে, যখন চার রাজ্য ও এক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোট নিয়ে সবাই ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার মধ্যেই সরকার ১৬ এপ্রিল থেকে তিন দিনের অধিবেশন চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেখানে নারী সংরক্ষণ আইন সংশোধন করতে চাইছে। বিরোধীরা সে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এবং এই পুরো ঘটনাটি ভারতের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।