শেরপুর-৩ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে
রাত পোহালেই শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাব ও পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শেষ মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মহড়া পরিচালিত হয়েছে।
নির্বাচনী প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বুধবার (৮ এপ্রিল) দিনভর ভোটগ্রহণের কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। দুপুরে উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে নির্বাচনের সরঞ্জাম প্রিসাইডিং অফিসারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এই প্রক্রিয়া তদারকি করেছেন। ইতিমধ্যে কেন্দ্রগুলোতে ভোটগ্রহণের সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সব সংস্থা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে। ১৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স, ১৬ প্লাটুন বিজিবি, ১৪টি র্যাব টিম, ২৬টি মোবাইল টিমসহ ১ হাজার ১৫০ পুলিশ সদস্য, ১ হাজার ৭০৪ জন আনসার সদস্য নির্বাচনে সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনীষা আহমেদ বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে প্রশাসন সবসময় তৎপর রয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল অব্যাহত আছে। সব ভোটকেন্দ্র সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কেউ আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন করার চেষ্টা করলে তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।’
প্রার্থীদের তালিকা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা
এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল, জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাসুদুর রহমান ও বাসদের (মার্কসবাদী) কাঁচি প্রতীকের প্রার্থী মিজানুর রহমান। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদল গত ৩ ফেব্রুয়ারি মারা যাওয়ায় এ আসনের নির্বাচন প্রথমে স্থগিত ও পরে বাতিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। পরে ৯ এপ্রিল এ আসনে নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করে নতুন করে তফসিল ঘোষণা করা হয়।
১৭ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ভোটার ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন। ভোটকেন্দ্র ১২৮টি। ভোট কক্ষ ৭২১টি। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘শেরপুর-৩ আসনে ভোটার ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন। দুটি উপজেলায় ১৭ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনে ১২৮টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে গারো পাহাড়ি এলাকার ৩২টি কেন্দ্রকে দুর্গম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
বিএনপি ও জামায়াতের প্রচারণা
শেরপুর-৩ আসনটিতে হারানো দুর্গ উদ্ধারে মরিয়া বিএনপি। অন্যদিকে মরহুম নুরুজ্জামান বাদলের ভাই মাসুদুর রহমান মাসুদ জামায়াতের মনোনয়ন নিয়ে আসনটিতে ভাগ বসাতে চাচ্ছেন। স্থানীয় ভোটাররা জানিয়েছেন, এখানে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ভোটের লড়াইটা জমে উঠবে।
একসময়ের বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত আসনটি পুনরুদ্ধারে দলের তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তবে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী মাসুদুর রহমান মাসুদ। ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী ডা. সেরাজুল হক। ১৯৯৪ সালের ২৮ অক্টোবর তার মৃত্যুর পর ১৯৯৫ সালের উপনির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন তার বড় ছেলে মাহমুদুল হক রুবেল। এরপর রুবেল বিএনপির প্রার্থী হয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন।
এবারের নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্য অর্জনে বিশাল নারী ভোট ব্যাংক দখলে নিতে বিএনপি প্রার্থীর স্ত্রী ফরিদা হক দিপা এবং মেয়ে রুবাইদা হক রিমঝিম প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাড়ায়-পাড়ায় উঠান বৈঠক করেছেন। অস্ট্রেলিয়ায় পড়ুয়া ছেলে রাফিদুল হক শিক্ষিত ও তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। পারিবারিক বিশেষ প্রচারণা সাধারণ ভোটার এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
অপরদিকে, শক্ত অবস্থানে মাঠে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ও শেরপুর জেলা জামায়াতের ব্যবসায়িক শাখা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টস অ্যান্ড বিজনেসমেন ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদুর রহমান মাসুদ। তিনি জামায়াত নেতা মরহুম মুহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদলের ছোট ভাই। নির্বাচনে বড় ভাইয়ের ইমেজ ও পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।
ভোটারদের মতামত
ভোটাররা বলছেন, জয়ের পথ কোনও প্রার্থীর জন্য সহজ নয়। এখানে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। জামায়াতের রয়েছে সংগঠিত কর্মী বাহিনী এবং নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক। যেটি বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের জন্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছে। আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও জামায়াত প্রার্থী জয়ের বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প নিয়েই প্রচারণা চালিয়ে গেছেন।
মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, ‘স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বন্যা ও করোনার দুর্যোগে আমি সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে ছিলাম। শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লা আমার চেনা। কোথায় কী সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনা- সবই আমার জানা। জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।’
জামায়াতের প্রার্থী মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন, ‘আসনটি আমার মরহুম বড় ভাইয়ের গড়ে তোলা। এখানকার ভোটাররা এখন সচেতন। পুরোনো রাজনৈতিক বক্তব্যে তারা প্রভাবিত হবেন না। মানুষ চাঁদাবাজ ও অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্তি চায় এবং জামায়াতকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখছে। নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী আমি। আমার বিশ্বাস, ভোটাররা আমাকে জয়ী করবেন। কারণ আমার বড় ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী হবে মডেল এবং গ্রিন উপজেলা। আমিও সে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছি।’
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তন চায়। আর এই ধারাকেই সামনে নিয়ে আমি প্রার্থী হয়েছি। আমার বিশ্বাস মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবে। আমি জয়ী হলে তাদের সমস্যা সমাধানে কাজ করবো। পাশাপাশি মানুষের যে ন্যায্য দাবি সেগুলো বাস্তবায়ন করবো।’



