শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশা: অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির পথে বাংলাদেশ
শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশা: অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি

শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশা: অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির পথে বাংলাদেশ

রাজনৈতিক সংগ্রাম ও তার সাফল্যের পর মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু একই সাথে সামাজিক জীবনে অস্থিরতা ও উত্তেজনাও বাড়তে থাকে। এই দুই দিকই ব্যক্তিকে চঞ্চল, অধৈর্য এবং প্রাপ্তির বিলম্বে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এসব প্রতিক্রিয়াজাত আবেগের মধ্যে পুঞ্জিভূত থাকে প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ। বিজয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। আবার এ সুযোগে অন্য কিছু গোষ্ঠী তাদের স্বার্থসিদ্ধির দাবি নিয়ে মাঠে নামে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিব্যবহার প্রাথমিক অস্থিরতা ও ক্রোধের বহিঃপ্রকাশকে যেন দীর্ঘায়িত করছে।

যুবসমাজের ভূমিকা ও নির্বাচনী প্রত্যাশা

যেকোনো অভ্যুত্থানে ছাত্র-তরুণেরাই সবচেয়ে সক্রিয় থাকে; আত্মদান ও সাহসী ভূমিকায়ও তারাই এগিয়ে থাকে। তাদের পরের কিশোর-কিশোরী জনগোষ্ঠী সমানতালে সক্রিয় না হলেও মানসিকভাবে একই উত্তেজনা ও ক্ষোভ-ক্রোধ ধারণ করে। শিশুমনে সৃষ্ট ভয় ও অসহায়তার বোধ এক ধরনের ট্রমা, যা পরিণতিতে মানসিক অস্থিরতা বাড়ায়। বড়রা যে এর বাইরে থাকেন, তা নয়। তবে সাতে-পাঁচে না থাকা মানুষ অনিশ্চয়তার সময়টি যত দ্রুত সম্ভব কাটুক, সেটাই চান। সেদিক থেকে সমাজের অধিকাংশ মানুষ একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশায় ছিলেন। বলা যায়, বেশির ভাগ ভোটারের এই চাহিদাই ২০২৬ সালের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হওয়ার অন্যতম কারণ।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে সমঝোতা ও সহিষ্ণুতার লক্ষণ ফুটে উঠেছিল এবং এ নিয়ে জনমনে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল, সংসদ সদস্যদের শপথের সময় সরকারি ও বিরোধী দলের ভিন্ন অবস্থান সেই স্বস্তিতে আঘাত করেছে। এতে জনমনে আবারও শঙ্কার মেঘ জমেছে। বিএনপি জোট ও জামায়াত জোটের এই বিরোধ কত দূর গড়াবে, তা মানুষকে ভাবাচ্ছে। সবার প্রত্যাশা, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাকে মর্যাদা দিয়ে উভয় পক্ষই উদ্ভূত পরিস্থিতি সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সামাল দেবে।

সংসদীয় দায়িত্ব ও জনগণের বিশ্বাস

সংসদে বিএনপি কেবল বড় শরিকই নয়, তারা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল। স্বভাবতই এ ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার প্রত্যাশা তাদের কাছ থেকেই বেশি। বলা বাহুল্য, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করা বা দলীয় পছন্দ চাপিয়ে দিলে পরিস্থিতি শান্ত না–ও থাকতে পারে। এর কিছু আভাস নবীন রাজনীতিকদের বক্তব্যেই ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। অন্যদিকে এটিও অনুধাবন করা জরুরি যে তাড়াহুড়োর মধ্যে প্রণীত জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে কিছু আইনি প্রশ্ন উঠেছে। ফলে সব পক্ষেরই এখন মাথা ঠান্ডা রেখে সমন্বিতভাবে কাজ করা ছাড়া বিকল্প নেই।

সাধারণ মানুষ চায়, সংসদের বৈঠকেই এসব বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হোক। মানুষের বিশ্বাস, রাজনীতিকেরা রাজনৈতিক অচলাবস্থা বা সংঘাতের সম্ভাবনা এড়িয়ে চলবেন। সংসদে সমাধান না হলে তার উত্তেজনা যদি রাজপথে উপচে পড়ে, তাহলে তরুণসমাজের অন্তত একাংশে আবারও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এটিও মনে রাখা দরকার, গত চুয়ান্ন বছরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অদক্ষতা, অন্যায় ও অবিচারের ফলে বহু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মনে গভীর ক্ষোভ ও ক্ষত জমেছে। এসব প্রশমন বা শুশ্রূষায় সব সময় সমভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সংঘাতময় রাজনীতি সমাজকে বিভক্ত করেছে; অপরাধকে লালন করেছে; অবিচারকে প্রশ্রয় দিয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও যুবসমাজের মানসিক স্বাস্থ্য

তবে এসব কথার মধ্য দিয়ে আজ যে বিষয়টি বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন, তা হলো সমাজ যদি দীর্ঘকাল অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা, উত্তেজনা-আক্রোশ ও ঘৃণা-বিদ্বেষের আবহে বাস করে (বা করতে বাধ্য হয়), তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের স্বাভাবিক মানবিক বিকাশ। এমনকি বয়স্ক মানুষেরও এর খেসারত দিতে হয়। বলা যায়, এমন পরিবেশ দীর্ঘস্থায়ী হলে সমাজমানস সুস্থতা হারায়; নিষ্ঠুর ও অমানবিক হয়ে ওঠে। এ অবস্থাকে অনেকে ‘বিষাক্ত’ বা ‘টক্সিক’, কেউ ‘ট্রমাক্রান্ত’ পরিবেশ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

আমাদের রাজনীতির ভাষা দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। ধর্মীয় বক্তাদের অনেকেই উত্তেজনা ও বিদ্বেষপূর্ণ ভাষণে অভ্যস্ত। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত হয় গালাগাল ও হলাহল। আমরা ভুলে যাই, এ দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে; এর মধ্যে ৫২ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে। অর্থাৎ দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ গড়ে ওঠার, তৈরি হওয়ার বয়সে রয়েছে। যদি বর্তমান জনসংখ্যা ১৮ কোটি ধরা হয়, তবে প্রায় ১০ কোটি মানুষ বিকাশপর্বের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে অবস্থান করছে। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এত বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে।

শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের গুরুত্ব

আমাদের দেশে সব স্তর মিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী আছে। তাদের মূল কাজ পড়াশোনা করা, শরীর ও চরিত্র গঠন করা এবং মানবিক, রুচিশীল ও উচ্চ নৈতিকতাভিত্তিক জীবনদৃষ্টির অনুশীলন করা। ফলে তাদের জন্য প্রথম প্রয়োজন স্থিতিশীলতা এবং সুস্থ, স্বাভাবিক ও ইতিবাচক পরিবেশ। মুক্তিযুদ্ধের সব ইতিবাচক অর্জন মাথায় রেখেও বলতে হয়, সেই অভিজ্ঞতা তরুণদের মধ্যে যে অস্থিরতা ও ট্রমা তৈরি করেছিল, তা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—এ নিয়ে তৎকালীন নেতৃত্বের মধ্যে যথেষ্ট ভাবনা দেখা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্বের ভাগীদার হওয়া এবং একে লাভজনক বিষয় করে তোলার এক নিয়ন্ত্রণহীন অমিতাচারে অনেকেই লিপ্ত হয়েছিলেন।

নতুন সরকার শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলছে; শিক্ষাকে আনন্দদায়ক ও মানসম্পন্ন করার কথাও শোনা যাচ্ছে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে গুরুত্ব বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানা যাচ্ছে। এসব আশাব্যঞ্জক। আশা করা যায়, শিক্ষা ও শিশু-তরুণদের সুস্থ মানসগঠনের কাজ দ্রুতই শুরু হবে। সুস্থ সমাজমানস তৈরির কার্যকর উপাদান হলো সমাজে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কলাচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরবচ্ছিন্ন সচলতা। একই সঙ্গে যথার্থ জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি, গবেষণার মান ও পরিমাণ বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা জরুরি।