পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির গণতান্ত্রিক বিজয় ও প্রতিবাদ
১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামো মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল, যা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও কেন্দ্রীয় শোষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই অসম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ছয় দফা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা, যা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচনা করে।
সামরিক শাসকের কৌশল ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল
এই রাজনৈতিক উত্তাপের মুখে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং কৌশলগতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের ‘এক ইউনিট’ ব্যবস্থা ভেঙে দেন, যার আসল লক্ষ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য পুনর্বিন্যাস করা এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনপ্রতিনিধিদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য খর্ব করা। একই সঙ্গে ‘লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার’ বা এলএফওতে শর্ত যুক্ত করা হয় যে নির্বাচিত গণপরিষদকে ১২০ দিনের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে, অন্যথায় পরিষদ বাতিল হয়ে যাবে। সামরিক ক্ষমতাকাঠামোর ধারণা ছিল, নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, যা তাদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ অটুট রাখবে। কিন্তু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, যা সামরিক জান্তার সমস্ত রাজনৈতিক সমীকরণকে অকার্যকর করে দেয় এবং বাঙালিদের গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট প্রতিষ্ঠিত করে।
অধিবেশন স্থগিত ও গণতান্ত্রিক রায়ের অবমূল্যায়ন
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মুখে পড়ে, বিশেষত পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং সামরিক নেতৃত্ব পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ক্ষমতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় অচলাবস্থা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে ১৩ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দেন যে ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু হবে, কিন্তু ১ মার্চ বেলা ১টা ৫ মিনিটে রেডিওতে তিনি আকস্মিকভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। গণতান্ত্রিক রায়ের এই সরাসরি অবমূল্যায়ন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়, যেখানে জগন্নাথ কলেজ ও কায়েদে আজম কলেজের শিক্ষার্থী, আদমজী পাটকলের শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করে রাজপথে নেমে আসেন এবং তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমান চলাচলও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
হরতাল, অসহযোগ আন্দোলন ও স্বাধীনতার প্রস্তুতি
হোটেল পূর্বাণীতে সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে ২ ও ৩ মার্চ সর্বাত্মক হরতাল এবং ৭ মার্চ জনসভার ডাক দেন, যার ফলে ২ মার্চ ঢাকা কার্যত একটি অচল নগরীতে পরিণত হয় এবং প্রশাসন, ব্যবসাকেন্দ্র ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় এদিন ছাত্রসমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়, যা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে। ২ মার্চ রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ কারফিউ জারি করলে বিক্ষুব্ধ জনতা তা ভঙ্গ করে এবং সামরিক বাহিনীর গুলিবর্ষণে শতাধিক মানুষ হতাহত হন, এর প্রতিক্রিয়ায় ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু কর-খাজনা প্রদান বন্ধের নির্দেশ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশব্যাপী সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন, যেখানে প্রথমবারের মতো ঢাকার কোনো সমাবেশে নারীদের লাঠি হাতে অংশ নিতে দেখা যায় এবং স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ: রাজনৈতিক ভারসাম্যের মাস্টারপিস
এই প্রেক্ষাপটেই ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যা ছিল সামরিক ও কূটনৈতিক চাপের মুখে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার এক অসাধারণ কৌশল। তিনি সরাসরি বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা না দিয়ে চারটি সুনির্দিষ্ট শর্ত উত্থাপন করেন:
- সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে;
- জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে;
- গোলাগুলি বন্ধ করে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে;
- বাঙালি হত্যার কারণ অনুসন্ধানে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে।
