রাজশাহীতে বিএনপি বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মারধর ও পানিতে অজু করানোর অভিযোগ
বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মারধর ও পানিতে অজু করানো

রাজশাহীতে বিএনপি বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মারধর ও পানিতে অজু করানোর অভিযোগ

রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার অভিযোগ তুলে কয়েকজনকে মারধর, পানিতে নামিয়ে অজু করানো এবং হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের অনুসারীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে এসব ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

নির্বাচনী প্রেক্ষাপট ও ঘটনার সূত্রপাত

এ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ইসফা খায়রুল হক শিমুল এবং ফুটবল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন লন্ডনপ্রবাসী বিএনপি নেতা রেজাউল করিম। নির্বাচনে জয়ী হন নজরুল ইসলাম মণ্ডল।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই বিদ্রোহী প্রার্থী রেজাউল করিমের অনুসারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তত পাঁচজনকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনকে মারতে মারতে পুকুরের পানিতে নামিয়ে অজু করানো হয় এবং ফুটবল প্রতীকে ভোট দেওয়াকে ‘ভুল’ স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়।

ভিডিও প্রমাণ ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আলী হোসেন ভুট্টু নামে এক ব্যক্তি লাঠি হাতে মইদুল ইসলাম নামের এক কাঠমিস্ত্রিকে গালিগালাজ করছেন। মইদুল হাতজোড় করে মারধর না করার অনুরোধ করলেও তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে তাকে পাশের পুকুরে নামিয়ে ‘অজু করে পবিত্র হয়ে উঠতে’ বলা হয়। পরে একগলা পানিতে দাঁড়িয়ে তাকে বলতে বাধ্য করা হয়- তিনি বিএনপি করেন, কিন্তু ফুটবলে ভোট দিয়ে জীবনে বড় ভুল করেছেন এবং ভবিষ্যতে আর এমন ভুল করবেন না।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মইদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে একই ধরনের ঘটনার শিকার পুঠিয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুল জব্বার চান্দুর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, ভোটের পরদিন পুঠিয়া থানার পাশের শিবচৌকি পুকুরের কাছে তাকে মারধর করা হয় এবং মোটরসাইকেলসহ পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, মারধরের সময় উপস্থিত ছিলেন- এমপির নাতি রিকো মণ্ডল, তার ভাই রূপোস, মুন্না ও সাগরসহ কয়েকজন। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। বর্তমানে তিনি এলাকায় না থেকে ঢাকায় চিকিৎসাধীন আছেন বলে জানান।

অন্যান্য হামলার ঘটনা ও প্রতিক্রিয়া

নির্বাচনের তিন দিন পর রামজীবনপুর মহল্লার ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক দুলাল হোসেনকেও মারধর করা হয়। তিনি বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গুরুতর আহত হয়ে কয়েকদিন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর এখন বাড়িতে রয়েছেন।

পুঠিয়া রাজবাড়িসংলগ্ন বাগানপাড়া এলাকার বিএনপি কর্মী আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ শেখের পা ভেঙে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনিও বর্তমানে অসুস্থ। এছাড়া পুঠিয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক মানবজমিনের উপজেলা প্রতিনিধি আরিফুল হক রুবেলও হামলার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, সাবেক পৌর মেয়র ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন খানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তাকে টার্গেট করা হয়।

এ বিষয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে সাবেক পৌর মেয়র আল-মামুন খান বলেন, ভোটের পর থেকে অন্তত ১০ জনকে মারধর ও পানিতে চুবানোর ঘটনা ঘটেছে। অনেককে হুমকি দেওয়া হয়েছে, কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

অভিযুক্ত ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আলী হোসেন ভুট্টু সরাসরি কিছু না বলে বিষয়টি নিয়ে ‘ঝামেলায়’ আছেন বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আরও কিছু মানুষকে পানিতে চুবানোর ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু ‘ঝামেলার কারণে’ তা করতে পারেননি।

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি এসব ঘটনা শুনেছেন। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এমন ঘটনা যাতে না ঘটে সেই বিষয়ে তিনি স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান। সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে বসা হবে।

পুঠিয়া থানার ওসি ফরিদুল ইসলাম বলেন, পানিতে নামানোর ঘটনা সম্পর্কে তিনি অবগত। তবে এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।