ঝিনাইদহ-৪ আসনে রাশেদ-ফিরোজের পরাজয়, জামায়াতের আবু তালিবের বিজয়
ঝিনাইদহ-৪: রাশেদ-ফিরোজ হারলেন, জামায়াত জিতল

ঝিনাইদহ-৪ আসনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চমকপ্রদ ফলাফল দেখা গেছে। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মো. রাশেদ খান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ উভয়েই ধরাশায়ী হয়েছেন। সব জল্পনা-কল্পনাকে পেছনে ফেলে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসাশিক্ষক মো. আবু তালিব। এই অপ্রত্যাশিত বিজয়ের পেছনে রয়েছে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ।

ভোটের পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ

নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, ঝিনাইদহ-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৬১ জন। এর মধ্যে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ভোটার ৭৭ হাজার ৫৩৩ জন এবং কালীগঞ্জ উপজেলায় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৯২৮ জন। অমুসলিম ভোটারের সংখ্যা ৫০ হাজার ৮৩৬ জন, যার মধ্যে সদর উপজেলায় মাত্র ৭ হাজার ৩৬৬ জন।

ফলাফলে দেখা যায়, ফিরোজ ৭৭ হাজার ১০৪ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন। অন্যদিকে রাশেদ খান ধানের শীষ মার্কায় ৫৬ হাজার ২২৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। বিজয়ী আবু তালিব দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ১ লাখ ৫ হাজার ৯৯৯ ভোট পেয়েছেন। মজার বিষয় হলো, ফিরোজ ও রাশেদের প্রাপ্ত ভোট একত্রে করলে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩২৬ ভোট হয়, যা জামায়াতের প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে ২৭ হাজার ৩২৫ ভোট বেশি।

জামায়াতের কৌশল ও নীরব ভোটার

সরকারি সংস্থাগুলোর নির্বাচনপূর্ব জরিপে ফিরোজের জয়লাভের সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল। রাশেদের তৃতীয় স্থান পাওয়ার পূর্বাভাস সঠিক প্রমাণিত হলেও জামায়াতের বিজয়ের কথা কেউ প্রকাশ করেনি। জামায়াতের মজবুত গোপন কৌশল এবং নারী ও নতুন ভোটারদের সমর্থন এই বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নীরব ভোটারদের শঙ্কাকে উপেক্ষা করায় ফিরোজ ও রাশেদ পিছিয়ে পড়েন।

বিএনপির ভরাডুবির কারণ

ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির পরাজয়ের পেছনে দীর্ঘদিনের দলীয় বিভাজন দায়ী। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শহিদুজ্জামান বেল্টুর পরাজয়ের পর থেকেই দলটি এই আসন হারিয়ে ফেলে। ২০২৬ সালে দলের হাইকমান্ড রাশেদ খানকে প্রার্থী করলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা ব্যাপক বিরোধিতা করে। ২০২৫ সালের ১২ জুন কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়, যা দলকে নেতৃত্বশূন্য করে তোলে।

বেল্টুর সময় থেকেই দলে বিভাজন শুরু হয়। হামিদুল ইসলাম হামিদের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ বেল্টুর বিরোধিতা করে, যা পরবর্তীতে মারধর ও অফিস দখলের মতো ঘটনায় রূপ নেয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বেল্টুর মৃত্যুর পর এই বিভাজন আরও তীব্র হয়।

২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রেক্ষাপট

২০২৬ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্থানীয় নেতাকর্মীরা রাশেদ খানের বিরোধিতা করে রাজপথে নেমে আসে। ফিরোজ, হামিদ এবং বেল্টুর স্ত্রী মুর্শিদা খাতুন একত্রিত হয়ে রাশেদকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। বিএনপির হাইকমান্ডের কঠোর অবস্থানের কারণে রাশেদকে প্রার্থী করা হয়, কিন্তু দলীয় সমর্থনের অভাবে তিনি পর্যাপ্ত ভোট পেতে ব্যর্থ হন।

রাশেদ খান নিজ দল গণঅধিকার পরিষদ ত্যাগ করে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ লাভ করেন এবং ঝিনাইদহ-২ আসনে প্রচারণা চালান। তার গরম বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।

এই নির্বাচনে জামায়াতের আবু তালিবের বিজয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করেছে। ভোটারদের মনোভাব এবং দলীয় ঐক্যের গুরুত্ব আবারও প্রমাণিত হয়েছে। ঝিনাইদহ-৪ আসনের এই ফলাফল ভবিষ্যত রাজনীতির জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।