চট্টগ্রাম-১৫ আসনে জামায়াতের বিজয়: সংগঠনের শক্তি নাকি প্রতিপক্ষের দুর্বলতা?
দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া–সাতকানিয়া আংশিক) আবারও নিজেদের দখলে রাখল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপি জয় পেলেও এ আসনে পুরনো ‘দুর্গ’ পুনরুদ্ধার করেছে জামায়াত। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একাধিক কৌশলগত ও সাংগঠনিক কারণ এ ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি ও প্রার্থীর সাফল্য
স্বাধীনতার পর থেকেই আসনটি জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে এখান থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন দলটির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী। এবারের নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ৭২ হাজার ৬১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নাজমুল মোস্তফা আমিন পেয়েছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ২৫ ভোট।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওয়ার্ড থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত দীর্ঘদিনের তৃণমূলভিত্তিক সংগঠন ও সক্রিয় নেটওয়ার্ক নির্বাচনি মাঠে বড় ভূমিকা রেখেছে। ভোটের আগে নিয়মিত গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও কেন্দ্রভিত্তিক সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করা হয়। বিশেষ করে নারী, প্রবাসী ও পোস্টাল ভোটারদের বড় অংশ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে গেছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। তরুণ ভোটারদের সম্পৃক্ত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিত প্রচারণাও ছিল লক্ষণীয়।
স্থানীয় ইস্যু—বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন প্রচারণায় গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি প্রার্থী হিসেবে শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত ইমেজ, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সামাজিক-ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা তাকে বাড়তি সুবিধা দেয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও দুর্বলতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য শুরু থেকেই জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে। অপরদিকে বিএনপি কোনো প্রার্থী দেয়নি। জামায়াতের প্রার্থী নগর জামায়াতের সাবেক আমির ও সাবেক এমপি শাহাজাহান চৌধুরী নির্বাচনি প্রচার শুরু করেছেন গত ফেব্রুয়ারি থেকে। প্রচারণার আগেই দলটি মাঠ গুছিয়ে এনেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল শুরু থেকেই এ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিল। একাধিক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী হওয়ায় মাঠপর্যায়ে বিভক্তি তৈরি হয়। মনোনয়ন ঘোষণার পর বঞ্চিত অংশের কর্মসূচি ও প্রকাশ্য অসন্তোষ দলীয় ঐক্যে চিড় ধরায়। যদিও পরে কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতাদের হস্তক্ষেপে সমঝোতার ঘোষণা আসে, তৃণমূলের হতাশা পুরোপুরি কাটেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন উপজেলা পর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ে নিয়মিত সভা-সমাবেশ না হওয়া এবং একাধিক গ্রুপে বিভক্ত রাজনীতির প্রভাবও নির্বাচনে পড়েছে বলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের ধারণা।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২০ সালে লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর থেকেই, নির্বাচনের তফশীল ঘোষনার আগেও লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপি নাজমুল মোস্তফা আমিন সাবেক সভাপতি আসহাব উদ্দিন চৌধুরী ও সদস্য সচিব সাজ্জাদুর রহমান এবং সাবেক সম্পাদক এসএম ছলিম উদ্দিন চৌধুরী খোকন এ তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল। ৫ আগস্টের পরে প্রতিটি গ্রুপ আলাদা আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করত।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত ১৭ বছর লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে কোনো সভা-সমাবেশ হয়নি। এ কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অনেকটা হতাশ হয়ে পড়েছিল, যার প্রভাব এ নির্বাচনে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ ও জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
তবে বিএনপি নেতাদের অভিযোগ ভিন্ন। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া বলেন, নির্বাচনের আগে আমাদের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি ছিল সেটা সত্যি। তবে আমরা নির্বাচনের আগেই তা নিরসন করেছি। এবারের নির্বাচনে একজন ত্যাগী ও ক্লিন ইমেজের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের স্বজনপ্রীতি, ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং, পেশীশক্তি আর কালো টাকার মাধ্যমে আমাদের প্রার্থীর বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। যদি তারা ইলেকশন ইন্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে আমাদেরকে হারিয়ে না দিত, তাহলে ইতিহাস অন্যরকম হত বলেও জানান এ বিএনপি নেতা।
অভিযোগের বিষয়ে জামায়াত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী বলেন, এলাকাবাসীর আস্থা ও ভালোবাসার ফল এই বিজয়। ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সাতকানিয়া-লোহাগাড়াবাসীর সুখে-দুঃখে পাশে ছিলাম। প্রতিকূল সময়েও হাল ছাড়িনি। ৫ আগস্টের পর থেকে সরাসরি মানুষের পাশে ছিলাম। ব্যালটের মাধ্যমে মানুষ সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছে। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও এলাকাবাসীর পাশে থাকব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের ফলাফল শুধু একটি নির্বাচনি জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংগঠনের দৃঢ়তা ও পরিকল্পিত কৌশল যেখানে জামায়াতকে এগিয়ে দিয়েছে, সেখানে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও মাঠপর্যায়ের দুর্বলতা বিএনপিকে পিছিয়ে দিয়েছে—এমনটাই মনে করছেন তারা।
প্রসঙ্গত, শাহজাহান চৌধুরী এ আসন থেকে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে দুই দফা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে স্বাধীনতার পর বিএনপি প্রার্থী হিসেবে মরহুম মোস্তাক আহামদ চৌধুরী এবং সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে কর্নেল অলি আহামদ (বীরবিক্রম) এই আসনে জয়লাভ করেন।
