ময়মনসিংহে জামায়াতের ভোটে অভূতপূর্ব বৃদ্ধি: ১৯৯৬ সালের তুলনায় ১৫ গুণ বেশি
ময়মনসিংহ বিভাগের ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে জামায়াতে ইসলামী। বাকি ছয়টি আসনে শরিক দলের প্রার্থীরা নির্বাচনে লড়েছেন। পাঁচটি আসনের মধ্যে একটি আসনে প্রথমবারের মতো জয় পেয়েছে জামায়াত। যদিও চারটি আসনে পরাজিত হয়েছে দলটি, তবে সর্বশেষ এককভাবে অংশ নেওয়া ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে সার্বিকভাবে জামায়াতের ভোট বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
আসনভিত্তিক প্রার্থী বণ্টন ও ভোটের বিশ্লেষণ
এবারের নির্বাচনে ময়মনসিংহ-৪, ৫, ৬, ৭ ও ১০ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ-১ ও ২ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ময়মনসিংহ-৩ আসনে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ময়মনসিংহ-৮ আসনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ময়মনসিংহ-৯ আসনে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি এবং ময়মনসিংহ-১১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির মনোনীত প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ময়মনসিংহের ১১টি আসনেই দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী দিয়েছিল জামায়াত। সে সময় নামমাত্র ভোট পেলেও ৩০ বছরের ব্যবধানে দাঁড়িপাল্লার ভোট ১৫ গুণের বেশি বেড়েছে। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী থাকা ময়মনসিংহ-৪, ৫, ৬, ৭ ও ১০ আসনে ১৯৯৬ সালে জামায়াত মোট ভোট পেয়েছিল ৩৩ হাজার ৫৯ ভোট। আর এবারের নির্বাচনে পাঁচটি আসনে পেয়েছে ৫ লাখ ২ হাজার ৩৪৫ ভোট। তিন দশকের ব্যবধানে দলটির ভোট বেড়েছে ১৫ গুণের বেশি, যা একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক মাইলফলক।
আসনওয়ারি ভোটের হারের বিস্তারিত তুলনা
ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসন: ১৯৯৬ সালে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী গোলাম রব্বানী পেয়েছিলেন ৪ হাজার ২০৩ ভোট। এবার মহানগর জামায়াতের আমির কামরুল আহসান পেয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৮০ ভোট। ৩০ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪৩ গুণ ভোট বেড়েছে দাঁড়িপাল্লার। এ আসনে মাত্র ৭ হাজার ৭৭৮ ভোটের ব্যবধানে এমপি হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দ।
ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) আসন: ১৯৯৬ সালে জামায়াতের সিরাজুল ইসলাম খান পেয়েছিলেন ৪ হাজার ৭০২ ভোট। এবার এখানে কেন্দ্রীয় জামায়াতের মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি মো. মতিউর রহমান আকন্দ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১ লাখ ২ হাজার ২২৬ ভোট পেয়েছেন। সেই হিসাবে জামায়াতের ভোট বেড়েছে প্রায় ২২ গুণ। এ আসনে ২৬ হাজার ৬৭০ ভোট বেশি পেয়ে এমপি হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসন: ১৯৯৬ সালে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে অধ্যাপক জসিম উদ্দিন পেয়েছিলেন ১৯ হাজার ৩৭৮ ভোট। সেটিই ওই নির্বাচনে জেলার ১১ আসনের মধ্যে জামায়াতের সর্বোচ্চ ভোট ছিল। তিনি অবশ্য ১৯৯১ সালে ২১ হাজার ৮৩০ ভোট এবং ২০০১ সালে ৪৭ হাজার ৩৭৫ ভোট পেয়েছিলেন। এবার জসিম উদ্দিন দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মো. কামরুল হাসান ৭৭ হাজার ৩২৫ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো বিজয়ী হয়েছেন, যা দলের জন্য একটি ঐতিহাসিক সাফল্য।
ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসন: ১৯৯৬ সালে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ফজলুল হক খান পেয়েছিলেন মাত্র ৪ হাজার ৯৩৯ ভোট। এবার জামায়াতের প্রার্থী মো. আছাদুজ্জামান দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৮৫১ ভোট। ১৯৯৬ সালের সঙ্গে তুলনা করলে দাঁড়িপাল্লার ভোট বেড়েছে প্রায় ১৭ গুণ। এ আসনে ১৪ হাজার ২৩৪ ভোটের ব্যবধানে ধানের শীষের প্রার্থী মো. মাহবুবুর রহমান এমপি হয়েছেন।
ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসন: ১৯৯৬ সালে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নুরুল ইসলাম পেয়েছিলেন ১ হাজার ৮৩৯ ভোট। এবার জামায়াতের প্রার্থী মো. ইসমাঈল দাঁড়িপাল্লা নিয়ে পেয়েছেন ৬৬ হাজার ৬৩ ভোট। ১৯৯৬ সালের সঙ্গে তুলনা করলে দাঁড়িপাল্লার ভোট বেড়েছে প্রায় ৩৬ গুণ। এ আসনে ৯ হাজার ৫২২ ভোটের ব্যবধানে এমপি হন ধানের শীষের প্রার্থী মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান।
জামায়াত নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
জেলা জামায়াতের আমির আবদুল করিম বলেন, ‘আমাদের ওপর দীর্ঘ ১৭ বছর চরম নির্যাতন চললেও আমরা মানুষের সঙ্গে ছিলাম। জনগণের সঙ্গে থাকায় তাঁদের আপদে-বিপদে পাশে থাকায় এবার মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছে। আমাদের ধারণ করায় ভোটারদেরও ধন্যবাদ। আমরা ব্যক্তিগতভাবে স্বার্থ ও সুবিধার জন্য কখনো রাজনীতি করি না। আমরা মানুষের স্বার্থের জন্য কাজ করি, এটি মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়েছে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এবার আরও কয়েকটি আসনে তাঁদের জয় পাওয়ার কথা ছিল। দিনভর ভালো ভোট হলেও গণনার সময় ভিন্ন পরিবেশ তৈরি হয়। এ জন্য ফলাফল তাঁদের পক্ষে আসেনি। তবে তাঁরা আশাহত নন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি অব্যাহত রাখবেন বলে জানান।
