ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের লড়াই: মাত্র ৭ জন বিজয়ী, ৯৭% ভোট পেয়েছেন ১৯ জন
সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের লড়াই: মাত্র ৭ জন বিজয়ী

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের চিত্র: মাত্র ৭ জনের বিজয়

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৮৭ জন নারী প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে মাত্র ৭ জন বিজয়ী হতে পেরেছেন, যা নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারী প্রার্থীরা মোট ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৯৪১টি ভোট পেয়েছেন।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা ১৯ জনের আধিপত্য

মজার বিষয় হলো, ৮৭ নারী প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। এই ১৯ জনই নারী প্রার্থীদের মোট প্রাপ্ত ভোটের ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। বাকি ৬৮ জনের মধ্যে ৬৬ জন ৩ হাজারের নিচে ভোট পেয়েছেন, আর মাত্র দুজনের ভোটসংখ্যা ৩ থেকে ৫ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

বিজয়ী নারী প্রার্থীদের তালিকা

সাতজন বিজয়ী নারী প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির প্রার্থীরা প্রাধান্য বিস্তার করেছেন। তারা হলেন:

  • মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খানম
  • ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো
  • সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর
  • নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন
  • ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম
  • ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ আহমেদ

এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা বিজয়ী হয়েছেন। তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন।

নারী প্রার্থীদের বৈষম্য ও চ্যালেঞ্জ

ফরিদপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচিত নায়াব ইউসুফ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, "নারীর প্রতি বৈষম্য ও অপপ্রচারের কারণে নারীরা বেশিসংখ্যক আসনে জয়ী হননি। একটি গোষ্ঠী ও দল চায় নারীরা অন্ধকারে পড়ে থাকুক।" তাঁর এই মন্তব্য নারীদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চলমান সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটায়।

নির্বাচনের অন্যান্য পরিসংখ্যান

এবারের নির্বাচনে নারী-পুরুষ মিলিয়ে মোট প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ২৮ জন। শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় সেখানে নির্বাচন হয়নি। চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনে ভোট হলেও আইনি জটিলতার কারণে ফল ঘোষণা করা হয়নি। নির্বাচন কমিশন ২৯৭টি আসনের ফল ঘোষণা করেছে।

নারী প্রার্থীদের হলফনামা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, তাদের ৭৫ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত এবং প্রায় ৬৭ শতাংশ কর্মজীবী। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নের তালিকায় নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল অপ্রতুল। মনোনয়নের বিপরীতে জয় পেয়েছেন ৮ শতাংশের বেশি নারী, যা পুরুষদের তুলনায় ১৫ শতাংশ কম।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চমক

৮৭ নারী প্রার্থীর মধ্যে ৬৬ জন দলীয় প্রার্থী এবং ২১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রুমিন ফারহানা একমাত্র বিজয়ী হয়েছেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন।

ময়মনসিংহ-৬ আসনের আখতার সুলতানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয় সর্বাধিক ভোট পেয়েছেন। ৭৬ বছর বয়সী এই নারী প্রার্থী ৫৩ হাজার ৩৩১ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবস্থান করেন।

সর্বাধিক ও সর্বনিম্ন ভোটপ্রাপ্ত নারী প্রার্থী

নারী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বাধিক ভোট পেয়েছেন মানিকগঞ্জ-৩ আসনের আফরোজা খানম। তিনি ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। অন্যদিকে, সর্বনিম্ন ১৫৩ ভোট পেয়েছেন দুজন নারী প্রার্থী। মোট ২৭ জন নারী প্রার্থী ৩০০-এর নিচে ভোট পেয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতামত

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নবিষয়ক বিশ্লেষক লিপিকা বিশ্বাস মনে করেন, আইনসভায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোক আরও এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, "গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এমন বিধান রাখা যাতে, নারীদের মনোনয়ন না দিলে কোনো দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না পায়।" তাঁর মতে, দলগুলোকে বিবেচনায় রাখা উচিত যে নারী ভোটারদের সমর্থন প্রার্থীদের জিতিয়ে এনেছে।

এদিকে, ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী তাসলিমা আখতারের মতে, আরও বেশিসংখ্যক নারীকে মনোনয়ন দেওয়া, নারীবিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা এবং নারীদের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীদের ভোটে নির্বাচিত করার হার বাড়ানো সম্ভব।

সর্বোপরি, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নারীদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বের দুর্বল চিত্রই তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞরা আশা করেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলো নারী প্রার্থীদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে এবং তাদের মনোনয়নের হার বৃদ্ধি করবে।