রাজশাহীর আলোকছত্র গ্রামে ভোটের দিনে মিষ্টির মেলা ও রাজনৈতিক সম্প্রীতি
রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের অন্তর্গত আলোকছত্র গ্রামে ভোটকেন্দ্রের বাইরে বসেছে মিষ্টির দোকানের মেলা। ভোট দিয়ে বের হওয়ার পর ভোটাররা সরাসরি এসে জড়ো হচ্ছেন মিষ্টির দোকানে। কম করে হলেও আড়াই শ গ্রামের প্রত্যেকে জিলাপি বা রসগোল্লা কিনছেন, যা এই এলাকার ভোটের একটি সুপ্রাচীন ঐতিহ্য।
গ্রামের নামের তাৎপর্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
আলোকছত্র গ্রামের নামটি বাংলা একাডেমির ‘বাঙলা উচ্চারণ অভিধান’ অনুযায়ী ছত্র অর্থ ছাতা, অন্নাদির বিতরণকেন্দ্র বা লাইন। সরল অর্থে গ্রামের নামের অর্থ দাঁড়ায় আলোর ছাতা বা আলো বিতরণের স্থান। যদি আলোকের অর্থ জ্ঞান ধরা হয়, তাহলে এটি জ্ঞানের ছাতা বা জ্ঞান বিতরণের কেন্দ্র। গ্রামের নামানুসারেই এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি উচ্চবিদ্যালয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতেই অবস্থিত ভোটকেন্দ্র, যেখান থেকে বেরিয়েই ভোটাররা মিষ্টির দোকানে হাজির হন।
রাজনৈতিক বিভেদহীন আড্ডা ও ঐক্য
উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে একদল লোক চেয়ার পেতে গোল হয়ে বসে আছেন, যেখানে দোকান থেকে চা-মিষ্টি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। মজার বিষয় হলো, এই আড্ডায় বসা ব্যক্তিরা কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের নন। তাঁদের মধ্যে জামায়াত, বিএনপি, দলীয় পরিচয়হীন এমনকি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও উপস্থিত। তাঁরা বলছেন, এটাই এই এলাকার সংস্কৃতি এবং কোনো দিন ছোট-বড় কোনো ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা এখানে ঘটেনি।
কলেজশিক্ষক ইকবাল হোসেন স্মরণ করিয়ে দিলেন, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৫৩৬টি ভোট আর বিএনপি প্রার্থী পেয়েছিল ৫৩৫টি ভোট। একটি ভোটের ব্যবধান থাকলেও এখানকার মানুষের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়নি। তবে তারপর থেকে এই কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে, যা স্থানীয়দের জন্য দুঃখের কারণ, কারণ এখানে নির্বাচন নিয়ে কোনো ঝুঁকিই নেই বলে তাঁরা দাবি করেন।
মিষ্টির ব্যবসা ও ভোটারদের আগ্রহ
বেলা পৌনে তিনটার দিকে ৫২ শতাংশ ভোট পড়ার পর দেখা গেল মিষ্টির দোকান প্রায় খালি হওয়ার পথে। দোকানগুলোতে ১০ থেকে ১৫ রকমের মিষ্টান্ন রয়েছে, যার মধ্যে দুই ধরনের রসগোল্লা, কালোজাম, গোল জাম, খুরমা, চিনি ও গুড়ের জিলাপি, ছানার জিলাপি, লাড্ডু, বুন্দিয়া, সন্দেশ এবং বাতাসা উল্লেখযোগ্য।
একটি দোকানে কর্মী উজ্জ্বল কুমার মহন্ত জানান, তাঁর বাবা মিষ্টির কারিগর এবং তিনি সিমেন্ট কোম্পানিতে চাকরি করেন। ভোটের ছুটিতে এসে বাবাকে সহযোগিতা করছেন। দেড় মণ জিলাপি ভাজা হয়েছিল এবং সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে রসগোল্লা। মানুষ দোকানে বসেও খাচ্ছেন আবার কিনে নিয়েও যাচ্ছেন, একজন সর্বোচ্চ তিন কেজি পর্যন্ত রসগোল্লা কিনেছেন।
স্থানীয় ঐতিহ্য ও ভোটারদের অভ্যাস
আড্ডায় বসে জানা গেল, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় প্রার্থী বেশি থাকায় মিষ্টির বিক্রি বেড়ে যায় এবং দোকানের সংখ্যাও বাড়ে। তখন প্রার্থীরা সবার হাতে মিষ্টি ধরিয়ে দিতেন, এমনকি কেউ না এলে বাড়িতেও পৌঁছে দিতেন। এবার প্রার্থীরা মিষ্টি কিনে দিচ্ছেন না, কিন্তু এই কেন্দ্রের রেওয়াজ অনুযায়ী সবাই ভোটকেন্দ্রে এলে মিষ্টান্ন কিনেন, তাই ভোটাররা নিজেরাই কিনছেন।
প্রসাদ পাড়া গ্রামের খালিদুজ্জামান, যিনি একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন, বলেন এখানকার ঐতিহ্য হলো ভোটকেন্দ্রে এলে মিষ্টি কিনতেই হবে এবং কেউ খালি হাতে ফেরেন না। তিনি এক কেজি রসগোল্লা কিনেছেন। অনিতা মহন্ত ভোট দিয়ে এসে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রসগোল্লা কিনলেন।
আলোকছত্র গ্রামের আলতাফ হোসেন আধা কেজি গুড়ের খুরমা কিনেছেন, কারণ তাঁর স্ত্রী ও বাচ্চারা এটি খুব পছন্দ করে। এই মিষ্টি মানুষগুলো যেন মিষ্টি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন এবং রাজনীতির তিক্ততা তাঁদের স্পর্শ না করে, তা কামনা করা যায়।
এই ভোটকেন্দ্রে গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়নের আলোকছত্র, প্রসাদ পাড়া, চকতাঁতীহাটি ও পলাশী গ্রামের ভোটাররা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে আসেন। স্থানীয় নির্বাচনের জন্য বিলাসী নামের আরও একটি গ্রামের মানুষ এই কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন। শুনে অবাক লাগে, কখনোই রাজনৈতিক কারণে এই এলাকার মানুষের মধ্যে কোনো বিভেদের সৃষ্টি হয়নি।
