রংপুরের ৬ আসনে ৪০ হাজার ২৭৯ ভোট বাতিল, পুনর্গণনার দাবিতে উত্তাল রাজনীতি
রংপুরে ৪০ হাজার ভোট বাতিল, পুনর্গণনার দাবি

রংপুরের ছয় আসনে ৪০ হাজার ২৭৯ ভোট বাতিল, পুনর্গণনার দাবিতে উত্তেজনা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর জেলার ৬টি সংসদীয় আসনে প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী মোট ৪০ হাজার ২৭৯টি ভোট বাতিল হয়েছে। এই বাতিল ভোটের সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে বিএনপির পরাজিত প্রার্থীরা ফলাফলে তীব্র আপত্তি তুলে পুনর্গণনার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন।

ভোটার ও বাতিল ভোটের পরিসংখ্যান

জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন, যার মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ছয় হাজার ৩৩৩ জন, পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩১ জন। ছয়টি আসনে মোট ৮৭৩টি কেন্দ্রে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এবং মোট ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ১৭ লাখ ২১ হাজার ৩২৮ জন ভোটার।

রিটার্নিং কর্মকর্তা ও রংপুর জেলা প্রশাসকের ঘোষিত ফল অনুযায়ী সরকারের প্রকাশিত গেজেটে প্রতিটি আসনের বিস্তারিত তথ্য নিম্নরূপ:

  • রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া): মোট ভোটার তিন লাখ ৭৫ হাজার ২২৭ জন, ভোট দিয়েছেন দুই লাখ ২৮ হাজার ৪৫৭ জন (৬০.৮৯%), বাতিল ভোট ৫ হাজার ৩১৩টি।
  • রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ): মোট ভোটার তিন লাখ ৮০ হাজার ৯২১ জন, ভোট দিয়েছেন দুই লাখ ৬১ হাজার ৮৪৬ জন (৬৮.৭৪%), বাতিল ভোট ৫ হাজার ৬৪৩টি।
  • রংপুর-৩ (সদর): মোট ভোটার পাঁচ লাখ ৮ হাজার ২২৩ জন, ভোট পড়েছে তিন লাখ ২৪ হাজার ৭৯৫টি (৬৩.৯১%), বাতিল ভোট ৭ হাজার ২০৩টি।
  • রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া): মোট ভোটার পাঁচ লাখ ৯ হাজার ৯০৬ জন, ভোট দিয়েছেন তিন লাখ ৩৮ হাজার ৩১৪ জন (৬৬.৩৫%), বাতিল ভোট ৮ হাজার ২৬৩টি।
  • রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর): মোট ভোটার চার লাখ ৬৯ হাজার ১৮৯ জন, ভোট দিয়েছেন তিন লাখ ২০ হাজার ৪৮৯ জন (৬৬.৩৫%), বাতিল ভোট ৮ হাজার ৪০৫টি।
  • রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ): মোট ভোটার তিন লাখ ৫৫ হাজার ৭৩৫ জন, ভোট দিয়েছেন দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪২৭ জন (৬৯.৫৫%), বাতিল ভোট ৫ হাজার ৪৫২টি।

বিএনপির আপত্তি ও আন্দোলন

বিশেষ করে রংপুর-৪, রংপুর-৩ ও রংপুর-৬ আসনে ফল নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছেন বিএনপির পরাজিত প্রার্থীরা। তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করেছেন এবং মামলার হুমকি দিয়েছেন। রংপুর-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আখতার হোসেন শাপলা কলি প্রতীকে এক লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন, যেখানে বিএনপির এমদাদুল হক ভরসা পেয়েছেন এক লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট। ৯ হাজার ৪০২ ভোটের ব্যবধান এবং ৮ হাজার ২৬৩টি বাতিল ভোটের কারণে পুনর্গণনার দাবি জোরালো হয়েছে।

রংপুর-৬ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াত নেতা নূরুল ইসলাম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এক লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন, অন্যদিকে বিএনপির সাইফুল ইসলাম পেয়েছেন এক লাখ ১৭ হাজার ৭০৩ ভোট। মাত্র দুই হাজার ৪২৫ ভোটের ব্যবধান এবং পাঁচ হাজার ৪৫২টি বাতিল ভোট, যা ব্যবধানের দ্বিগুণেরও বেশি, এই আসনে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এই আসনের একটি বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রে ধানের শীষের সিল মারা কিছু ব্যালট পেপার উদ্ধার হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

বিবাদী ও প্রশাসনের বক্তব্য

বিএনপি নেতাদের দাবি, বাতিল ভোটের সংখ্যা ও ব্যবধান বিবেচনায় নিয়ে পুনরায় গণনা করা হলে ফল ভিন্ন হতে পারে এবং তারা ভোট গণনায় অনিয়মের অভিযোগ করেছেন। রংপুর-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু বলেন, ‘আমরা নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পন্থায় আন্দোলন শুরু করেছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের কারণে প্রকৃত ফল হয়নি।

অন্যদিকে, রংপুর জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ এনামুল আহসান দাবি করেছেন যে নির্বাচন কমিশনের বিধি-বিধান মেনেই স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ ও গণনা সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাতিল ভোট নির্বাচন প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অংশ। প্রতিটি কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ লিখিতভাবে আবেদন করলে তা আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হবে।’

বিশ্লেষক ও স্থানীয়দের মতামত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাতিল ভোট ভবিষ্যতে নির্বাচনি ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। একইসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বাড়তি নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। রংপুরের বিশিষ্ট আইনজীবী একরামুল হক বলেন, ‘এত ভোট বাতিল হওয়া চিন্তার বিষয়। ভোটারদের আরও সচেতন করা দরকার ছিল। যদি সন্দেহ থাকে, তাহলে পুনর্গণনা হলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।’

পীরগঞ্জের বাসিন্দা ভোটার সানজিদা আখতার বলেন, ‘ভোটার উপস্থিতি ভালো হয়েছে, এটা ইতিবাচক। তবে বাতিল ভোটের সংখ্যা কমাতে ভবিষ্যতে কমিশনকে আরও উদ্যোগ নিতে হবে।’ বিএনপির পরাজিত প্রার্থীরা দাবি করেছেন যে কোনো সংসদ নির্বাচনে এর আগে এত বিপুলসংখ্যক ভোট বাতিল হয়নি, তাই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে রংপুরের নির্বাচনি ফলাফল নিয়ে চলমান বিতর্ক ও আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা ভবিষ্যতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সংস্কারের দাবিকে আরও শক্তিশালী করছে।