২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির রাত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে। টেলিভিশনের পর্দায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হতে থাকলে সারাদেশের মানুষ উত্তেজনায় উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশবাসী একটি অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়, যা গণতন্ত্রের এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
গণতন্ত্রের বিজয় ও নতুন যাত্রা
এই ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে দলটি এককভাবে ২১১টি সংসদীয় আসনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য বলে স্বীকৃতি দেন। তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের জালিয়াতি বা কারচুপির ঘটনা ঘটেনি।
এই বিজয়ের পটভূমিতে রয়েছে দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের বিতর্কিত রাতের নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে এক ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই শাসনের পতন ঘটে এবং দেশে গণতান্ত্রিক ধারা পুনরুদ্ধারের পথ সুগম হয়।
এক নেতার অদম্য যাত্রাপথ
মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার পথ মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন এবং কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৮৮ সালে, যখন তিনি গাবতলী উপজেলা বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। গাবতলী উপজেলা তার পিতা জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক জন্মস্থান, যা উত্তরবঙ্গের বগুড়া জেলায় অবস্থিত। ১৯৯৩ সালে তিনি বগুড়া জেলা বিএনপির সদস্য হন এবং ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সংগঠক থেকে জাতীয় নেতা
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া যে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, দলের 'ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন স্ট্র্যাটেজি কমিটি'র সদস্য হিসেবে তারেক রহমান সেসব আসনের নির্বাচনী প্রচারণা সমন্বয় করেন। ওই পাঁচ আসনে তার মায়ের নিরঙ্কুশ বিজয় প্রমাণ করে যে তিনি একজন দক্ষ সংগঠক এবং ভবিষ্যতে দলের নেতৃত্বে আসার যোগ্যতা রাখেন।
২০০১ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রচারণার দায়িত্ব পালন করেন এবং সারা দেশে 'ধানের শীষ' প্রতীকের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে তার কৌশল সফল হয়। বিএনপি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সেই নির্বাচনে জয়লাভ করে। বিজয়ের পর ২০০২ সালে বিএনপির স্থায়ী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে তাকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করে।
নির্যাতন ও নির্বাসনের বছরগুলো
রাজনীতিতে তারেক রহমান যখন বিকশিত হচ্ছিলেন, তখনই তাকে চিরতরে শেষ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। কুখ্যাত সেনা-সমর্থিত ১/১১ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়
- এক পর্যায়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং মাসের পর মাস অমানবিকভাবে নির্যাতন করা হয়
- নির্মম নির্যাতনে মেরুদণ্ডের গুরুতর আঘাত পাওয়ায় তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে চলে যান
- বাধ্য হয়ে তিনি নির্বাসনে থাকার পথ বেছে নেন
তবে তার অদম্য মনোবল এবং জনগণের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি তাঁকে থামতে দেয়নি। যুক্তরাজ্য থেকে অনলাইনে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তিনি দেশের মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যান।
ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই
শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনকালে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে তার অনুপস্থিতিতে ১৭টি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা। এমনকি শেখ হাসিনার সরকার জিয়া পরিবারকে হয়রানির উদ্দেশ্যে তাদের সেনানিবাসের বাড়ি ভেঙে ফেলে।
২০১৮ সালে যখন তার মা বেগম খালেদা জিয়া মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে বন্দী হন, তখন তাঁকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়। কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে নয়, বরং তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের উৎকর্ষতার কারণেই এ পদে তাঁকে মনোনীত করা হয়। তখন থেকেই তিনি স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
বিজয় ও প্রধানমন্ত্রীত্বের পথে
নির্বাসনে থাকলেও জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তারেক রহমান থেমে থাকেননি। তার দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও আহ্বান অবশেষে জাতিকে জাগিয়ে তোলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ শাসনের অবসান ঘটে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন দিনের সূচনা হয়।
- ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর তারেক রহমানের দেশে ফেরার পথ সুগম হয়
- ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি বীরের বেশে দেশের মাটিতে পা রাখেন
- খালি পায়ে হেঁটে দেশের মাটি ছুঁয়ে দেখেন এবং হৃদয়ের গভীরে বাংলাদেশকে অনুভব করেন
- বিশাল জনসমুদ্রে তার প্রাণবন্ত কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অ্যান্ড ফর দ্য কান্ট্রি'
দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিন পর তার মমতাময়ী মা বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন, যা পুরো জাতির জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি তারেক রহমান দলের চেয়ারম্যান হন, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে তার অনিবার্য উত্থানেরই অংশ।
এক নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি
তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থান কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে হয়নি, বরং তিনি তার নেতৃত্বগুণ, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, অন্তর্দৃষ্টি, নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার কারণে রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষে ওঠে এসেছেন। কঠোর পরিশ্রম, দক্ষতা ও ধৈর্যের সমন্বয়ে তিনি কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাতিকে অপশাসন, অরাজকতা, নিপীড়ন, জোর-জবরদস্তি ও দমন-পীড়নের অচলাবস্থা থেকে বের করে আনবেন। তিনি জনগণকে সেই অধিকার ফিরিয়ে দেবেন, যা তারা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বঞ্চিত হয়েছে।
তার এই প্রতিশ্রুতি মানুষের হৃদয় জয় করেছে এবং এর ফলেই জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিশাল জয় পেয়েছে। বাংলাদেশ আজ আবারো একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং তারেক রহমানের হাত ধরে পুনরায় গণতান্ত্রিক পথচলা শুরু হয়েছে। একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছে জাতি, যার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
