ফরিদপুর-৪ আসনে বিএনপির শহিদুল ইসলামের ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনের গল্প
ফরিদপুর-৪ আসনে বিএনপির শহিদুল ইসলামের বিজয়ের গল্প

ফরিদপুর-৪ আসনে বিএনপির শহিদুল ইসলামের ঐতিহাসিক বিজয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-৪ আসনে (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন) বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম ১ লাখ ২৭ হাজার ৪৪৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মো. সরোয়ার হোসাইন ৭৫ হাজার ৮০৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। এই জয়ের ব্যবধান প্রায় ৫১ হাজার ভোট, যা এই আসনে বিএনপির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নেতার নির্দেশে আসন পরিবর্তন ও সংগ্রামের শুরু

শহিদুল ইসলামের এই বিজয়ের পথ মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি নিজের আসন ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা-সালথা) ছেড়ে ফরিদপুর-৪ আসনে কাজ শুরু করেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নগরকান্দার কোনাগ্রামে তাঁর বাড়িতে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সমর্থকদের কাঁদিয়ে তিনি নিজ আসন থেকে সরে দাঁড়ান এবং নগরকান্দা ও সালথার নেতা-কর্মীদের বিদায় জানান।

শহিদুল ইসলাম বলেন, 'এই নগরকান্দায় এত যুদ্ধ, এত সংগ্রাম। তারেক রহমান আমাকে ফরিদপুর-৪ আসনের জন্য কাজ করার কথা বলেছেন। আমি আমার নেতার কথা ফেলতে পারিনি। সম্পর্ক হয় আদর্শের। এ সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের চেয়ে অনেক মূল্যবান।' কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

বিরোধ ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে অগ্রসর

ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থিতা নিয়ে শহিদুল ইসলামের সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) শামা ওবায়েদের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট দুই পক্ষের সমর্থকদের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। এই ঘটনার পর উভয় নেতার দলীয় পদ স্থগিত করা হয়, যদিও পরে তা তুলে নেওয়া হয়। সালথায় আধিপত্য নিয়ে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনাও এই বিরোধের অংশ ছিল।

এক বছরের নিরলস প্রচেষ্টা ও চ্যালেঞ্জ

ফরিদপুর-৪ আসনে কাজ করার নির্দেশ পেয়ে শহিদুল ইসলাম এক মুহূর্তও বসে থাকেননি। তিনি তিন উপজেলায় দলকে সংগঠিত করেছেন, ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছে টেনে নিয়েছেন এবং এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে সুনামধারী আওয়ামী লীগ নেতাদেরও দলে ভিড়িয়েছেন। তাঁর মতে, 'যাঁরা আওয়ামী লীগ করেছেন, তাঁরা সবাই তো খারাপ নন। সবাইকে তো আমি বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিতে পারব না।'

গত সেপ্টেম্বরে নির্বাচন কমিশন ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ও হামিরদী ইউনিয়ন ফরিদপুর-৪ থেকে কেটে ফরিদপুর-২ আসনের সঙ্গে যুক্ত করে। এই বিভাজন নিয়ে তীব্র আন্দোলনের পর হাইকোর্টে জনগণের দাবি আদায় করে শহিদুল ইসলাম বিজয়ীর বেশে ফিরে আসেন।

নির্বাচনী প্রচারণা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা

ফরিদপুর-৪ আসনে মোট আটজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন। ভোট গ্রহণের এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মিজানুর রহমান জামায়াতের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। অন্যদিকে, এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজাহিদ বেগকে সমর্থন দেন, যা প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

বিজয়ের পরের দিনের ঘটনা ও বক্তব্য

বিজয়ের পরদিন শহিদুল ইসলাম ভাঙ্গার চান্দ্রা ইউনিয়নের পাচকুল গ্রামে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মো. সরোয়ার হোসাইনের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করে বলেন, 'আমরা প্রতিপক্ষ ছিলাম না, প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম। নির্বাচন শেষ, এখন উন্নয়নের রাজনীতি হবে।'

২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শূন্য হাতে ফরিদপুর-৪ আসনে কাজ শুরু করেছিলেন শহিদুল ইসলাম। ঠিক এক বছর পর ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ভাঙ্গা বাজারের ঈদগাহ মাঠে হাজারো মানুষের সমাবেশে তিনি বলেন, 'আমি শূন্য হাতে আপনাদের কাছে এসেছিলাম। আপনারা আমাকে ফেলে দেননি। বরং আমাকে মন ভরে ভোট দিয়েছেন। শূন্য হাতে আপনাদের কাছে এসেছিলাম, আজ আমি পূর্ণ, আজ আমি ধন্য।'

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ

দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফরিদপুর-৪ আসনে ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া জাতীয় কোনো নির্বাচনে বিএনপি জিততে পারেনি। নগরকান্দার কোনাগ্রাম থেকে আসা শহিদুল ইসলামের এই জয় তাই অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে মাঠপর্যায়ে তাঁর ধারাবাহিক তৎপরতা, গ্রামভিত্তিক গণসংযোগ, কৃষক সংগঠনের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দ্রুতই জনসমর্থনে রূপ নেয়। কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর পরিচিতি তৃণমূলে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।