খুলনায় বিএনপি ও জামায়াতের অপ্রত্যাশিত পরাজয়: পরওয়ার ও মঞ্জু হারলেন
খুলনায় বিএনপি-জামায়াতের অপ্রত্যাশিত পরাজয়

খুলনায় বিএনপি ও জামায়াতের হেভিওয়েট নেতাদের অপ্রত্যাশিত পরাজয়

খুলনার সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই হেভিওয়েট নেতার অপ্রত্যাশিত পরাজয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। খুলনা-৫ আসনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং খুলনা-২ আসনে বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু পরাজিত হয়েছেন। এছাড়া জামায়াতের প্রথম হিন্দু প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী বিশাল ব্যবধানে হেরেছেন।

কৃষ্ণ নন্দীর বিশাল ব্যবধানে পরাজয়

খুলনা-১ (বটিয়াঘাটা-দাকোপ) আসনে বিএনপি প্রার্থী আমীর এজাজ খান জয়লাভ করেছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫২ ভোট, অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী পেয়েছেন ৭০ হাজার ৩৪৬ ভোট। ব্যবধান ৫১ হাজার ছয় ভোটের। কৃষ্ণ নন্দী জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসে প্রথম হিন্দু ধর্মাবলম্বী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তিনি জামায়াতের ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আসনটিতে ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যাদের মধ্যে আটজনই হিন্দু সম্প্রদায়ের। ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৭ হাজার ১০৩ জন, যেখানে এক লাখের বেশি ভোট হিন্দু সম্প্রদায়ের। ডুমুরিয়ার বাসিন্দাকে জামায়াতের প্রার্থী করায় স্থানীয় ভোটাররা বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি, ফলে হিন্দু ভোট বিভক্ত হয়ে যায়। জয়ী আমীর এজাজ খান এই প্রথম সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং তার ভোটের ব্যবধান খুলনায় সবচেয়ে বেশি।

মিয়া গোলাম পরওয়ারের নাটকীয় পরাজয়

খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পরাজিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৬ ভোট, অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আজগর লবী পেয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৫৪ ভোট। মাত্র ২ হাজার ৬০৮ ভোটের ব্যবধানে লবী জয়লাভ করেছেন।

২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকারের আমলে গোলাম পরওয়ার এই আসন থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ-সদস্য আলী আজগর লবী দলীয় সিদ্ধান্তে খুলনা-৫ আসনে নির্বাচন করেন এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে জামায়াতের এই হেভিওয়েট নেতাকে হারান। লবী ফোন করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এই খবর জানিয়েছেন, যার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।

জামায়াতের একটি সূত্র জানিয়েছে, গোলাম পরওয়ার ভোট পুনরায় গণনার জন্য আবেদন করতে পারেন। তিনি কয়েকটি কেন্দ্রের ফলাফল এবং বাজেয়াপ্ত ভোট নিয়ে সন্ধিহান। ডুমুরিয়া উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট বেশি, সেখানে তুলনামূলক কম ভোট পেয়েছেন গোলাম পরওয়ার। ভোটারদের দাবি, হিন্দু ভোটারদের সমর্থন এবং নতুন একজন সংসদ-সদস্যকে বেছে নিতেই তারা লবীকে জয়লাভ করিয়েছেন।

নজরুল ইসলাম মঞ্জুর বিএনপি ঘাঁটিতে পরাজয়

খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু পরাজিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৮৮ হাজার ১৯৭ ভোট, অন্যদিকে জামায়াত নেতা শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৭৭৯ ভোট। ব্যবধান ৫ হাজার ৫৮২ ভোট।

এই আসনটি খুলনায় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনে বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এই আসন থেকে জয়লাভ করেছিলেন, এবং ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালেও আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। নজরুল ইসলাম মঞ্জু ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজানকে হারিয়েছিলেন।

নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পরাজয়ের পেছনে দলীয় কোন্দল বড় ফ্যাক্ট হিসেবে কাজ করেছে। তার নির্বাচনি কাজে নগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। অন্যদিকে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থীকে খুব বেশি গুরুত্ব না দেওয়াও আরেকটি কারণ হতে পারে বলে অভিযোগ করেন অনেকে বিএনপি নেতা।

সার্বিক ফলাফল ও রাজনৈতিক প্রভাব

খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে জয়লাভ করেছে বিএনপি এবং দুটিতে জামায়াতে ইসলামী। এবারের সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে যত হেভিওয়েট প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে গোলাম পরওয়ার ও নজরুল ইসলাম মঞ্জু উল্লেখযোগ্য। তাদের পরাজয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে দলীয় কৌশলগত ব্যর্থতা এবং স্থানীয় ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জামায়াতের নেতাকর্মীরা তাদের হেভিওয়েট নেতার পরাজয় সহজে মেনে নিতে পারছেন না। অন্যদিকে, বিএনপিতেও নজরুল ইসলাম মঞ্জুর হার নিয়ে অভ্যন্তরীণ সমালোচনা শুরু হয়েছে। এই নির্বাচনী ফলাফল খুলনার রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং ভবিষ্যত রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।