সেরা নির্বাচনের দাবি বনাম বাস্তবতা: বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, কমিশনের ভূমিকা
সেরা নির্বাচন দাবি বনাম বাস্তবতা: বিশ্লেষকদের প্রশ্ন

সেরা নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তব চিত্র: একটি গভীর বিশ্লেষণ

নির্বাচনের ঠিক এক বছর আগে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একটি সাহসী দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "আগামী জাতীয় নির্বাচন দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।" পরবর্তীতে তিনি বারবার এই বক্তব্য উচ্চারণ করেছেন, যা জনমনে প্রত্যাশার সৃষ্টি করেছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সেই বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে: আসলেই কি এই নির্বাচন সেরা হয়ে উঠতে পেরেছে, নাকি কেবল সময়মতো সম্পন্ন হওয়া এবং বড় ধরনের অঘটন এড়ানোই প্রধান উপদেষ্টার ধন্যবাদযোগ্য সাফল্য?

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে: শান্তিপূর্ণ হলেই সেরা নয়

বিশ্লেষকরা একমত যে, এই নির্বাচন খুব শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, শান্তিপূর্ণ হওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেরা নির্বাচন হওয়ার মানদণ্ড নয়। ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্র্যান্ডসেনের সঙ্গে বৈঠকে ড. ইউনূস আবারও জোর দিয়েছিলেন, "সরকার বাংলাদেশের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনকে সর্বকালের সেরা এবং ঐতিহাসিক করার পরিকল্পনা করছে। তারা একটি উদাহরণ, একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ তৈরি করতে চান।"

ধন্যবাদযোগ্য দিক: সময়ানুবর্তিতা ও সহিংসতা এড়ানো

কমিশন গঠন, প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং নির্বাচনের প্রস্তুতির টাইমলাইন সময়মতো শেষ করতে পারার জন্য প্রধান উপদেষ্টা ও তার পরিষদ অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। একইসঙ্গে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখা এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এড়াতে পারার জন্যও অনেকে তাদের প্রশংসা করছেন। তবে এখানে দলগুলোর নিজস্ব দায়িত্বশীল আচরণকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়া: প্রশ্ন ও বিতর্ক

গত ডিসেম্বরে নির্বাচন কমিশন ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে। তফসিল ঘোষণার ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছিলেন, "একই দিনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও আয়োজন করা হবে।" ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন ও শঙ্কার মধ্যে এই ঘোষণা সত্ত্বেও, মানুষ শেষ দিন পর্যন্ত জানতে চেয়েছে— নির্বাচন আদৌ হবে কিনা। এমনকি গত ১২ জানুয়ারি, ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ড. ইউনূস নিশ্চিত করেছিলেন, "নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেও নয়, এক দিন পরেও নয়, ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে।"

নির্বাচনের মান: গণনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয়

সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার উল্লেখ করেন, "নির্বাচনে কেবল ভোট দিতে পারলেই হবে না— সেটা সঠিক ও ন্যয়সঙ্গত হলো কিনা সেদিকেও নজর থাকতে হয়।" তিনি বলেন, "যারা ভোট দিতে চেয়েছে তারা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছে, দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের সহিংসতা ঘটেনি। সেদিক থেকে সংশ্লিষ্ট সবাই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু গণনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিছু দল ও প্রার্থী প্রশ্ন তুলেছেন, তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ না করে নির্বাচন কমিশন পুনর্গণনা করতে পারতো। এর জন্য নতুন করে নির্বাচন করতে হতো না, কেবল গণনার সদিচ্ছা থাকলেই হতো। সেটা না করে গেজেট করে দেওয়ায় নির্বাচন কমিশনের কাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।" এছাড়া, কয়েকজন ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকের বিষয় সমাধান না করে তাদের প্রতি শিথিলতা দেখানোও নির্বাচনের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে।

সেরা নির্বাচনের শর্ত: অংশগ্রহণ থেকে আস্থা

সাধারণত একটি নির্বাচনকে 'সেরা' বলতে হলে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা হয়:

  • অংশগ্রহণমূলক কিনা, অর্থাৎ সব বড় দল অংশ নিয়েছে কিনা
  • ভোটার উপস্থিতির হার
  • স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা
  • সহিংসতামুক্ত পরিবেশ
  • আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন
  • জনগণের আস্থার মাত্রা

বাংলাদেশের বিভিন্ন নির্বাচন— যেমন ১৯৯১, ১৯৯৬ (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে), ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪— নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। কোনো নির্বাচন অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার জন্য প্রশংসিত হয়েছে, আবার কোনোটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ভোটার উপস্থিতি: পরিসংখ্যান ও তুলনা

সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯.৪৪ শতাংশ, এবং গণভোটে মোট ৬০.২৬ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোটগ্রহণের পরদিন শুক্রবার নির্বাচন কমিশন এই তথ্য প্রকাশ করে। স্বাধীনতার পর থেকে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের ভোটার উপস্থিতি ২০১৪ ও ২০২৪ সালের তুলনায় বেশি হলেও ২০০৮ সালের রেকর্ড অংশগ্রহণের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছিল ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে— ৮৭.১৩ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ: অংশগ্রহণের সংজ্ঞা

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পর্যবেক্ষণ মিশনের মতে, একটি নির্বাচন 'অংশগ্রহণমূলক' হলো কিনা তা শুধু ভোটের হার দিয়ে বোঝায় না। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার একটি হোটেলে মিশনের প্রধান আইভার্স ইজাবস বলেন, তাদের দৃষ্টিতে, "অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমাজের সব প্রতিনিধিত্বশীল গোষ্ঠীর অংশগ্রহণই মুখ্য বিষয়। এই নির্বাচনে আমরা যা পর্যবেক্ষণ করেছি তা হলো, এটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ছিল এবং ২ হাজার প্রার্থীর উপস্থিতিতে ভোটারদের সামনে পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল ব্যাপক।"

বিতর্ক ও সহিংসতা: নির্বাচন-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও কিছু আসনের ফলাফল বিতর্কিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ডা. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, "নির্বাচনের পরিবেশ ভালো ছিল। তবে ফলাফল ঘোষণার সময় কিছু আসনের ফলাফল ছিল বিতর্কিত। তারচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো নির্বাচন পরবর্তী দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। আমরা এরই মধ্যে খবর পেয়েছি জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের লোকদের বহু বাসা-বাড়ি, পরিবারের সদস্য ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বর্বর হামলা চালানো হয়েছে।" আগামী সোমবার এ নিয়ে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা।