খুলনা-২ আসনে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি ভেঙে জামায়াতের ঐতিহাসিক জয়, পরাজয়ের কারণ অভ্যন্তরীণ কোন্দল
খুলনা-২ আসনে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি ভেঙে জামায়াতের জয়

খুলনা-২ আসনে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি ভেঙে জামায়াতের ঐতিহাসিক জয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে হারিয়ে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এটি প্রথমবারের মতো খুলনা নগরের কোনো আসনে জামায়াতের বিজয় হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে খুলনা-২ ও খুলনা-৬ আসনে জয় পায় জামায়াত। খুলনা-৬ আসনে জয় নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা থাকলেও খুলনা-২ আসনের ফল রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পরিচয়

খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, যিনি সংগঠক ও মাঠের নেতা হিসেবে সুপরিচিত। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতের মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল, যিনি খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। ভোটের আগে অনেক বিশ্লেষণে মঞ্জুর জয়ের সম্ভাবনা দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ইতিহাস বলছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে এ আসনে দীর্ঘদিন ধরেই শক্ত অবস্থানে ছিল বিএনপি। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে এখানে জয় পান সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী। ২০০১ সালে জয় পান বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালে জোটের ভরাডুবির মধ্যেও এ আসনে জয় পান নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ১৯৯৬ সালের পর জামায়াত এ আসনে কখনো প্রার্থী দেয়নি, সেবার জামায়াতের আনসার উদ্দীন ৮ হাজার ৪২৬ ভোট পেয়েছিলেন।

পরাজয়ের কারণ: অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দুর্বল প্রচারণা

বিএনপির অন্তত ২০ জন স্থানীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোট কম পড়া, দলীয় সমন্বয়ের ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিএনপির পরাজয়ের বড় কারণ। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, এ আসনে তুলনামূলক কম ভোট পড়েছে, যা বিএনপির জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ভোটের সমন্বয়ও এখানে হয়নি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াত মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। ঘরে ঘরে যোগাযোগ, নারী ভোটারদের কেন্দ্রে আনা এবং দলীয় কোন্দল না থাকা—এসব বিষয় তাঁদের পক্ষে কাজ করেছে। নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে জড়িত জামায়াতের একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আসনটি আমাদের কাছে নিশ্চিত ছিল না। তবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল আমাদের মাথায় ছিল। আমরা নির্বাচনের জন্য প্রচুর কাজ করেছি, ঘরে ঘরে গিয়েছি।’

বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন

অন্যদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি অংশের মতে, দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভাজন, কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং মাঠপর্যায়ে দুর্বল প্রচারণা পরাজয়ের কারণ হয়েছে। বিশেষ করে ভোটারদের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে না পারা এবং নারী ভোটারদের সক্রিয়ভাবে কেন্দ্রে আনতে না পারা বড় দুর্বলতা ছিল। নগরের বাগমারা এলাকার বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী বলেন, ‘আমাদের দেওয়া ভোটার স্লিপ সবার বাসায় পৌঁছেনি। বিএনপির নির্বাচনী প্রচার বাজার ও মূল সড়কে সীমাবদ্ধ ছিল। জামায়াত নারী কর্মীদের ব্যাপক কাজে লাগিয়েছে, আমরা সেভাবে পারিনি।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে খুলনা মহানগর বিএনপির কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সঙ্গে বর্তমান নেতা-কর্মীদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। মহানগর বিএনপির থানা ও ওয়ার্ড কমিটি থেকেও বাদ দেওয়া হয় মঞ্জু অনুসারীদের। দলীয় পদ হারানোর পরও রাজনীতি থেকে সরে যাননি তিনি। বিভিন্ন ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। এবারের নির্বাচনে মঞ্জুকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলে নগর বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অনেক নেতা এবং অনুসারীরা তা মেনে নিতে পারেননি। এমনকি প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার পরও দুই পক্ষ আলাদা কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করে। মঞ্জুর প্রার্থিতা বাতিলের দাবিও জানান বর্তমান কমিটির নেতারা। একপর্যায়ে প্রকাশ্য বিরোধ মিটিয়ে দুই পক্ষের নেতারাই মঞ্জুর পক্ষে মাঠে নামেন। তবে ভেতরের পুরোনো কোন্দল ভেতরেই রয়ে গিয়েছিল।

ভোটের দুই দিন আগে খুলনা নগরে বিএনপির বর্তমান কমিটির এক নেতা বলেন, ‘আমরা ধানের শীষে ভোট চাচ্ছি। তবে প্রার্থী ও তাঁর নিজের লোকদের কাছে সেভাবে মূল্যায়ন পাচ্ছি না। তিনি প্রার্থীকেন্দ্রিক রাজনীতি সাজিয়েছেন। ভেতরের ক্ষত আসলে পুরোটা উপশম হয়নি।’ খুলনা নগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম বলেন, ‘এখনো বুঝে উঠতে পারছি না এবার কেন হারলাম, হিসাব মিলছে না। আরও বিশ্লেষণ করার দরকার আছে।’