যশোরে বিএনপির ভূমিধস পরাজয়: জামায়াতের পাঁচ আসনে বিজয়, একটিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা
যশোর জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে বিএনপির প্রার্থীদের ভূমিধস পরাজয় ঘটেছে। মাত্র একটিমাত্র আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এই পরাজয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিষাদের ছায়া পড়েছে। অন্যদিকে, নিরঙ্কুশ বিজয়ে জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আনন্দ ও উৎসাহ বিরাজ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিএনপি প্রার্থীদের এমন ভূমিধস পরাজয়ের তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন।
পরাজয়ের কারণসমূহ
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম কারণ হলো দলীয় হঠকারী সিদ্ধান্ত। প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের পরিবর্তন করে নতুন প্রার্থীদের চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী মাঠে নামানো যায়নি। তৃতীয়ত, নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণার বিরুদ্ধে বিকল্প বয়ান দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি।
আসনভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ
যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আজীজুর রহমান, মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, মো. গোলাম রসুল, গাজী এনামুল হক ও মো. মুক্তার আলী বিএনপির প্রার্থীদের বড় ব্যবধানে পরাজিত করেন। একটিমাত্র আসনে ১৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জয় পেয়েছেন।
যশোর-১ (শার্শা)
এই আসনে ২৫ হাজার ৫৫১ ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আজীজুর রহমান বিজয়ী হয়েছেন। আজীজুর রহমান ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ১৯ হাজার ৯৩। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫৪২ ভোট। প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া মফিকুল হাসানকে বাদ দিয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় নুরুজ্জামান লিটনকে। এতে মফিকুল হাসানের অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে নির্বাচনী মাঠে তেমন সরব হননি। এমনকি জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে গোপনে কাজ করার অভিযোগও উঠেছে।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা)
এ আসনে খুলনা বিভাগে বিএনপির একমাত্র নারী প্রার্থী সাবিরা সুলতানাকে ৩৪ হাজার ৩১৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন জামায়াতের প্রার্থী মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। সাবিরা সুলতানার নির্বাচনী প্রধান এজেন্ট মুরাদুন-নবী বলেন, মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা নির্বাচনী মাঠে নামেননি। জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে সমন্বয় না ঘটা পরাজয়ের বড় কারণ। জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণার কারণে নারী ভোটারদের ভোট কম পাওয়া গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
যশোর-৩ (সদর)
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল কাদেরকে ১৩ হাজার ৮৭৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। শুরু থেকেই আসনটি বিএনপির জন্য নির্ভার হিসেবে ধরা হয়েছিল। নেতা-কর্মীরা মনে করেছিলেন, জামায়াতের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়তে পারবেন না। কারণ, অধিকাংশ ভোটার জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল কাদেরকে চেনেন না। অন্যদিকে এ আসনে বিএনপির মধ্যে দৃশ্যমান অভ্যন্তরীণ কোন্দল ছিল না। তারপরও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর)
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী গোলাম রসুল ৪৪ হাজার ৯৯৫ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফরাজীকে পরাজিত করেন। বিএনপির জনপ্রিয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন জাতীয় কৃষক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক টি এস আইয়ুব। কিন্তু ঋণখেলাপির দায়ে তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়। এ কারণে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে বিএনপি মতিয়ার রহমানকে মনোনয়ন দেয়। এতে বিক্ষুব্ধ টি এস আইয়ুবের সমর্থকেরা ধানের শীষ প্রতীকে ভোট না দিয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেন। এতে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থী জয়ী হন।
যশোর-৫ (মনিরামপুর)
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী গাজী এনামুল হক ৪৭ হাজার ৮৩১ ভোটের ব্যবধানে স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী রশিদ আহমাদ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছেন। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়া ইকবাল হোসেনের ভোট এবং বিএনপির প্রার্থী রশিদ আহমাদের ভোট একত্রে হলে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২০ ভোট হয়। সে ক্ষেত্রে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কেউ না থাকলে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী জয়ীও হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় সুবিধা পেয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী।
যশোর-৬ (কেশবপুর)
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. মুক্তার আলী ৯১ হাজার ১৮ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন আজাদ ৭৯ হাজার ৩২১ ভোট পান। প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হয় ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে। এক মাস প্রচার-প্রচারণায় থাকার পর রওনকুলকে পরিবর্তন করে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় কেশবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন আজাদকে। মনোনয়ন না পাওয়া রওনকুল এলাকা ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান করেন। আরেকজন মনোনয়ন না পাওয়া বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাসের অনুসারীরাও প্রচার প্রচারণার প্রথম দিকে আবুল হোসেনের পক্ষে ছিলেন না।
দলীয় প্রতিক্রিয়া
বিএনপির এমন ভূমিধস পরাজয়ের পেছনের কারণ জানতে চাইলে যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘সারা দেশে যেখানে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় হয়েছে, সেখানে যশোরে এমন পরাজয় কেন ঘটল, তা আমাদের বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেননি। বরং অনেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াতের পক্ষে কাজ করেছেন, এমন অভিযোগ আমাদের কাছে আছে। এ ছাড়া জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে নারী ভোটাররা জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। মূলত এই দুটি কারণে পরাজয় ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে আমার মনে হচ্ছে।’
