রাজশাহী-১ আসনে ভোট পুনঃগণনার আবেদন: বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগে জেলা প্রশাসকের জরুরি চিঠি
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) সংসদীয় আসনে ভোট পুনঃগণনার আবেদন নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিএনপি প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহী জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতার নির্বাচন কমিশন সচিবকে জরুরি ভিত্তিতে নির্দেশনা চেয়ে চিঠি দিয়েছেন।
অভিযোগ দাখিল ও জেলা প্রশাসকের পদক্ষেপ
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিএনপি প্রার্থী শরীফ উদ্দীন জেলা রিটার্নিং অফিসারের কাছে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ভোট পুনঃগণনার আবেদন দাখিল করেন। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার জেলা রিটার্নিং অফিসার নির্বাচন কমিশন সচিবকে চিঠি পাঠান। চিঠিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-১ আসনে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
জেলা রিটার্নিং অফিসারের চিঠিতে বলা হয়েছে, বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ এর ৩৭ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আসনের ভোট পুনঃগণনার জন্য দাখিল করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিষয়টি জরুরি বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনী ফলাফল ও বিএনপি প্রার্থীর বিস্তারিত অভিযোগ
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রাজশাহী-১ আসনে জামায়াতে ইসলামির প্রার্থী অধ্যাপক মজিবুর রহমানকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। বেসরকারিভাবে প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, অধ্যাপক মজিবুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৭১ হাজার ৭৮৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। অন্যদিকে, বিএনপি প্রার্থী শরীফ উদ্দীন ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯০২ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী জামায়াত প্রার্থী বিএনপি প্রার্থীর চেয়ে ১ হাজার ৮৮৪ ভোট বেশি পেয়েছেন।
বিএনপি প্রার্থী শরীফ উদ্দীন তার লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে আসনের অধিকাংশ কেন্দ্রে জামায়াত সমর্থক প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারসহ ভোট গ্রহণে নিয়োজিতদের বেছে বেছে নিয়োগ করা হয়। তিনি দাবি করেন, এসব জামায়াত প্রভাবিত ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা রাজশাহী-১ আসনের গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে পরিকল্পিতভাবে ৭ হাজার ৯৮৬টি বৈধ ভোট বাতিল করেছেন, যেগুলো ধানের শীষ প্রতীকে দিয়েছেন ভোটাররা।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রশাসনকে প্রভাবিত করে গোদাগাড়ীর ৫১নং ভানপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও মোহনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন কেন্দ্রের ব্যালট সংশ্লিষ্ট ভোট কেন্দ্রে গণনা না করে উপজেলা নির্বাচন অফিসে এনে ইচ্ছেমতো গণনার মাধ্যমে ফলাফল তৈরি ও প্রকাশ করা হয়েছে। জামায়াত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে এমন অনিয়ম করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অতিরিক্ত অনিয়মের দাবি ও ফলাফল গেজেট স্থগিতের আবেদন
বিএনপি প্রার্থী শরীফ উদ্দীন তার অভিযোগে আরও উল্লেখ করেছেন, পোষ্টাল ব্যালট গণনার ক্ষেত্রেও অনিয়ম করা হয়েছে। এছাড়া হাট গোবিন্দপুর ও ভানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ধানের শীষের এজেন্টদের সম্মতি ছাড়াই প্রশাসনের লোকজন ব্যালট বাক্স কেন্দ্র থেকে উপজেলায় নিয়ে গেছেন। ধানের শীষের এজেন্টদের স্বাক্ষর ছাড়াই ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, যা স্পষ্টভাবে পরিকল্পিত অনিয়মের ঘটনা বলে প্রমাণিত।
তিনি আরও দাবি করেন, কেন্দ্রের প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসাররা ফলাফল শিটে ধানের শীষের নির্বাচনি এজেন্টদের স্বাক্ষর গ্রহণ করেননি। এই সকল অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিএনপি প্রার্থী রাজশাহী-১ আসনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ স্থগিতেরও আবেদন করেছেন।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতার জানান, বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরবর্তী নির্দেশনা চেয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবের কাছে জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, "নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।"
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজশাহী-১ আসনে এই অভিযোগ ও ভোট পুনঃগণনার আবেদন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এখন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
