রেহমান সোবহান: সংস্কারের প্রধান বাধা কাঠামোগত, আইন প্রণয়ন নয়
রেহমান সোবহান: সংস্কারের বড় বাধা কাঠামোগত

সংস্কারের প্রধান বাধা কাঠামোগত: রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেছেন, দেশে সংস্কার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি সম্পূর্ণরূপে কাঠামোগত। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ডিফল্টাররা এখন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে এবং তারা বহু ক্ষেত্রে সংস্কারে বাধা সৃষ্টি করছে। এর ফলে সংস্কার আলোচনা শুধুমাত্র আইন প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়; এটিকে একটি ধারাবাহিক ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

সানেম সম্মেলনে বিশেষ বক্তব্য

রোববার দক্ষিণ এশীয় নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নবম বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের শেষ দিনে 'ইনফ্যাটুয়েশন উইথ রিফর্ম: দ্য স্টোরি অব বাংলাদেশ' শীর্ষক সেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে তিনি এসব মন্তব্য করেন। সেলিম রাইহান সেশনের সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং সাবেক অর্থ সচিব ও মহা-নিয়ন্ত্রক মুহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

সংস্কারের প্রকৃত অর্থ

রেহমান সোবহান বলেন, সংস্কার বলতে শুধু নতুন আইন প্রণয়ন বোঝায় না। প্রথমে আইন তৈরি, তারপর প্রশাসনিক কাঠামো গঠন, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সর্বশেষে ফলাফল মূল্যায়ন—এই সম্পূর্ণ চক্রটি শেষ না হলে সংস্কারের প্রকৃত সুবিধা অর্জন করা সম্ভব নয়। তাঁর অভিজ্ঞতায়, আইন পাস করা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় বাধা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি বলেন, কখনও কখনও সংস্কারকে তাত্ত্বিক বা বইয়ের আলোচনার বিষয় হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু বাস্তবে এগুলো প্রয়োগ করতে প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক দলের ভূমিকা

রাজনৈতিক দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সংস্কার বাস্তবায়নে প্রকৃত নেতৃত্ব ও প্রতিশ্রুতির স্পষ্ট অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দলীয় সদস্যরা তাদের নিজস্ব ইশতেহার সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা রাখেন না।

তিনি উল্লেখ করেন যে, অতীতে প্রধান সংস্কারগুলো তখনই সফল হয়েছে যখন সেগুলো জনগণের কাছ থেকে জোরালো সমর্থন পেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেন, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা হিসেবে জনগণ কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল। তিনি মন্তব্য করেন যে, বর্তমানে এমন গণ-আন্দোলন দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রস্তাব

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সংস্কার প্রস্তাব প্রসঙ্গে রেহমান সোবহান বলেন, এগুলো নতুন কিছু নয়; অনুরূপ প্রস্তাব বহু বছর ধরে আলোচনাধীন রয়েছে। সরকারগুলো প্রায়শই ঋণের কিস্তি পাওয়ার স্বার্থে কিছু প্রাথমিক অগ্রগতি দেখায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই হয় না। একইভাবে, উন্নয়ন অংশীদাররাও তাদের তহবিল বিতরণের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দিষ্ট ধরনের সংস্কার এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

বিচার বিভাগীয় ও বাজেট সংস্কার

বিচার বিভাগীয় সংস্কারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যদিও ১৯৯০-এর দশকে বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি দেখায় যে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব খুবই সীমিত। একইভাবে, রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট একীভূত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বহু বছর ধরে আলোচিত হলেও বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক বাজেটিং ব্যবস্থা চালুর গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, এটি সরকারকে কোন খাতে ব্যয় করে কী ফলাফল অর্জিত হয়েছে তা জনগণকে জানাতে সক্ষম করবে। বর্তমানে শুধু ব্যয়ের হিসাব রাখা হয়, কিন্তু সেই ব্যয়ের ফলাফলের বিশ্লেষণের অভাব রয়েছে।

সিভিল সোসাইটি ও বিরোধী দলের ভূমিকা

ভারতের উদাহরণ টেনে রেহমান সোবহান বলেন, সেখানে একটি শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলন খাদ্য, শিক্ষা ও কাজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ মূলত বিভক্ত, ফলে যেকোনো বড় সংস্কারের জন্য ঐক্যবদ্ধ চাপ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, বরং সরকারের কার্যক্রমের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে, তিনি সরকারের ভেতরে একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।