রাজশাহীতে নির্বাচনী হামলা: নারী প্রার্থী হাবিবা বেগমকে থাপ্পড়, থানায় অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি
রাজশাহীতে নারী প্রার্থীকে মারধর, থানায় অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি

রাজশাহীতে নির্বাচনী হামলা: নারী প্রার্থীকে প্রকাশ্যে মারধরের অভিযোগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের একমাত্র নারী স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবা বেগমকে ভোটকেন্দ্রের সামনে প্রকাশ্যে চড়-থাপ্পড় মারা হয়েছে। এই ঘটনায় থানায় অভিযোগ দিতে গেলে তা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

ঘটনার বিবরণ ও হামলার ভিডিও প্রমাণ

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোটগ্রহণ চলাকালে বেলা তিনটার দিকে হাবিবা বেগম পবা উপজেলার নলখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে যান। সেখানে তিনি ভোটারদের কাছে ভোট চাইছিলেন, যা দেখে ক্ষুব্ধ হন হরিয়ান ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি রজব আলী।

হামলার সময় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে রজব আলী হঠাৎ হাবিবা বেগমকে সজোরে একটি থাপ্পড় মারেন। এতে হাবিবা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়। কোনোমতে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে তাকে আবারও থাপ্পড় মারা হয়। পরে হাবিবার সঙ্গে থাকা লোকজন তাকে রক্ষা করেন এবং আরেক ব্যক্তি অভিযুক্তকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান।

হামলাকারীর বক্তব্য ও প্রার্থীর অবস্থা

হামলার বিষয়ে রজব আলী বলেন, তিনি জানতেন না যে ওই নারী নিজেই ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী। ভোটের দিন ভোট চাওয়া ঠিক নয়, এ কারণে তিনি নিষেধ করতে যান। তখন তাকে অশালীন ভাষায় গালি দেওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি একটি থাপ্পড় মারেন বলে স্বীকার করেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ভোটকেন্দ্রের আনুমানিক ১০০ গজ উত্তরে হাবিবা বেগম ও তার নির্বাচনি কর্মীদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। হাবিবা বেগম মোহনপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

থানায় অভিযোগ না নেওয়ার ঘটনা

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতেই হাবিবার প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট মো. আকবর হোসেন রাজশাহীর কাটাখালী থানায় এ অভিযোগ দিতে যান। কিন্তু থানায় দায়িত্বরত কর্মকর্তা জানান, থানায় এখন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেই। তাই অভিযোগ নেওয়া যাবে না।

থানায় অভিযোগ না নেওয়ায় রাতেই তিনি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ও রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগপত্রে নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য তদন্তপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা কামনা করা হয়।

পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

হাবিবার অভিযোগ না নেওয়ার বিষয়ে কাটাখালী থানার ওসি সুমন কাদেরী বলেন, হাবিবার প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ভোটের রাতে আসেন। তবে সে সময় তিনি ভোটের দায়িত্ব পালনের জন্য বাইরে ছিলেন। তিনি শুনেছেন, বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো একটি অনুলিপি নিয়ে এসেছিলেন। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার রাজশাহীর রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার বলেছিলেন, তিনি মারধরের ভিডিও দেখেছেন। হাবিবা চাইলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত বিচার হতে পারে।

নির্বাচনী প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

রাজশাহীর ছয়টি আসনে মোট ৩২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এরমধ্যে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে একমাত্র নারী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন হাবিবা বেগম। এই ঘটনা নির্বাচনী সহিংসতা ও নারী প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভোটকেন্দ্রের সামনে এমন প্রকাশ্য হামলা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুতর হুমকি। থানায় অভিযোগ না নেওয়ার ঘটনাটি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। এই ঘটনার তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।