রংপুরে নির্বাচনী পালাবদল: জাতীয় পার্টির পতন ও জামায়াতের উত্থান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে রংপুর বিভাগে রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ভোটে জাতীয় পার্টির শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে, যেখানে দলটি একটি আসনও জিততে পারেনি। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী বিভাগে সর্বোচ্চ আসন জয় করে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে, আর বিএনপির আসন সংখ্যা বেড়েছে, তবে বিভাগীয় শহর রংপুরসহ কিছু জেলায় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
জাতীয় পার্টির ঐতিহাসিক পতন
রংপুরের কেরামতিয়া জামে মসজিদের সামনের চা-দোকানে গত শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর মুন্সিপাড়ার বাসিন্দা সবুজ আলী, মকবুল হোসেন ও আহম্মদ মিয়াদের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল এই নির্বাচনের ফলাফল। সত্তরোর্ধ্ব সবুজ আলী, যিনি নিজেকে জাতীয় পার্টির কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন, বলেন, ‘ভোটের আগে মনে হচ্ছিল এবার রংপুরে জাতীয় পার্টি হারবে। কিন্তু এ রকম শোচনীয়ভাবে হারবে, এটা চিন্তা ছিল না।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ১৯৯১ সাল থেকে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দিলেও এবার মানুষের আবেগ কমে গেছে।
জাতীয় পার্টির ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে দলটি কোনো আসন পায়নি, এমনকি দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরও রংপুর-৩ আসনে পরাজিত হয়েছেন। এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনের মতে, রংপুরের মানুষ জাতীয় পার্টিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা দলের জন্য একটি বড় ধাক্কা। জাপা নেতারা এই পরাজয়কে ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’ বলে অভিহিত করলেও, বিশ্লেষকরা দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও আবেগভিত্তিক রাজনীতির ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন।
জামায়াতের অভাবনীয় বিজয়
এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী রংপুর বিভাগে ১৬টি আসন জয় করে সর্বোচ্চ আসন পাওয়া দলে পরিণত হয়েছে, যা একটি বিস্ময়কর ঘটনা। ২০০৮ সালের পর ১৮ বছর ধরে এই অঞ্চলে দলটির প্রভাব কম ছিল, কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সংগঠিত তৎপরতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা ফলাফলে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। রংপুর মহানগর জামায়াতের আমির এ টি এম আজম খান বলেন, ‘এর আগে এই এলাকায় জামায়াত-বিএনপির প্রভাব ছিল না। যার কারণে মানুষ নতুনটাকে বেছে নিয়েছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি ফখরুল আনামের মতে, জাতীয় পার্টির প্রতি সংক্ষুব্ধ ভোটারদের জামায়াত কাজে লাগাতে পেরেছে, যা তাদের বিজয়ে সহায়ক হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে গাইবান্ধার পলাশবাড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও রংপুরের মিঠাপুকুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়ে আসছিল।
বিএনপির মিশ্র ফলাফল
বিএনপির জন্য এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগে কিছু উন্নতি দেখা গেছে। দলটি দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিহাটের ১৪টি আসন জিতেছে, যা অতীতের তুলনায় বেশি। তবে বিভাগীয় শহর রংপুরসহ কুড়িগ্রাম ও নীলফামারীতে কোনো আসন পায়নি বিএনপি। গাইবান্ধা-৪ আসনে শামীম কায়সারের জয় ছাড়া অন্য জেলাগুলোতে দলের প্রার্থীরা সফল হননি।
বিএনপি নেতাদের মতে, নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও তৃণমূল কর্মীদের অবমূল্যায়নের কারণে আরও ভালো করার সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। রংপুরের একজন বিএনপি নেতা বলেন, ‘রংপুর বিভাগীয় শহর হলেও বিএনপি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে রংপুরকে নেতৃত্ব দেওয়ার লোক নগন্য। আবার যাঁরা আছেন, তাঁরাও রংপুর থেকে ভোট করেননি।’ তবে বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে সাংগঠনিকভাবে কাজ করলে আগামী দিনে অবস্থার উন্নতি হবে।
ভবিষ্যতের দিকে নজর
জাতীয় পার্টি এখন ভুলত্রুটি খুঁজছে ও সংগঠন পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন চৌধুরী জানান, জি এম কাদের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন সংগঠন ঠিক করতে ও কারণ বিশ্লেষণ করতে। অন্যদিকে, জামায়াতের বিজয় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, আর বিএনপি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রংপুরের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে, যা অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
