দুই যুগ পর ক্ষমতায় বিএনপি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২ আসনে বড় বিজয়
দুই যুগ পর ক্ষমতায় বিএনপি, ২১২ আসনে বড় বিজয়

দুই যুগ পর ক্ষমতায় বিএনপি, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২১২ আসনে বড় বিজয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দুই যুগ পর সরকার গঠনের পথে রয়েছে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার দুপুরে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ২৯৭টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও মিত্র দলগুলো ২১২টি আসন জয় করে একটি বড় বিজয় নিশ্চিত করেছে। এটি বিএনপির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিজয় হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। জাতি, ধর্ম ও লিঙ্গনির্বিশেষে সব শ্রেণির জনগণের রায়ে এই নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের জন্য দলটিকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হচ্ছে।

শান্তিপূর্ণ ও পরিচ্ছন্ন নির্বাচনের নজির

১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও পরিচ্ছন্ন ভোটের একটি নজির স্থাপন করেছে। এই সাফল্যের কৃতিত্ব অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, সশস্ত্র বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়া হচ্ছে। নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কঠোর নজরদারি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সংযত ভূমিকার কারণে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পেরেছে বলে মনে করা হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যাশা নাগরিকদের।

ভোটের হার ও গণভোটের ফলাফল

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৫৯.৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে, গণভোটে ভোটের হার ছিল ৬০.৮৪ শতাংশ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি, আর ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের আগেই জানিয়েছে যে ১৭ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে।

গণতন্ত্রে ফেরার সুযোগ ও স্থিতিশীল সরকারের প্রত্যাশা

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ বাংলাদেশকে গণতন্ত্রে ফেরার যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় একটি পরিচ্ছন্ন ও ভালো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ভঙ্গুর অর্থনীতি, রাষ্ট্র সংস্কার এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে একটি স্থিতিশীল সরকারই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত ছিল। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বিএনপির সামনে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এমন সরকারের পক্ষে সরকার পরিচালনার কাজটি সহজ হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও দ্রুত হয়। একই সঙ্গে আশা করা হয়, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরিবর্তনের যে বড় জন–আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে, তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনা করবে বিএনপি।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঝুঁকি ও সতর্কতার আহ্বান

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাষ্ট্র পরিচালনা সহজ করলেও এর ঝুঁকিও যে কম নয়, তার অসংখ্য নজির বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি দলের কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়। আশা করা হয়, শুরু থেকেই বিএনপি এই ঝুঁকির ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে।

সংস্কারের গুরুদায়িত্ব ও রাজনৈতিক সমঝোতা

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় বিএনপি সরকারের ওপর সংস্কারের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হচ্ছে। আগামী সংসদের প্রথম ১৮০ দিন একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভূমিকা পালন করবে। জুলাই সনদের কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির আপত্তি রয়েছে, যা তাদের ঘোষিত অবস্থান। তবে আশা করা হয়, এই বিবেচনায় ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিএনপি এমন কোনো অবস্থান নেবে না, যা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিএনপিকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে যে জুলাই সনদটি গণভোটে পাস হয়েছে।

রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে বিএনপি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা বা মীমাংসার পথ বেছে নেবে বলে আশা করা হয়। জাতীয় সংসদকে শুরু থেকেই তর্কবিতর্ক ও আলাপ-আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। সবারই মনে রাখা প্রয়োজন, এর ব্যত্যয় ঘটা মানেই বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তা, যা গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যে গণতান্ত্রিক উত্তরণযাত্রা শুরু হয়েছে, তা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব সবার।