এনসিপির নির্বাচনী ফলাফলে তরুণদের হতাশা ও জোটের প্রভাব
জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে নেতা নাহিদ ইসলামের বক্তব্য সত্ত্বেও দলটি ২০২৫ সালের নির্বাচনে ব্যাপক ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে। ৩০০ আসনের সংসদে এনসিপি পেয়েছে মাত্র ছয়টি আসন, যা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের আশাকে ভোটব্যাংকে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
বিএনপির জয় ও এনসিপির পিছিয়ে পড়া
নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভোটারেরা দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিকে বিপুলভাবে সমর্থন করেছেন, যারা আগে তিনবার ক্ষমতায় ছিল। অন্যদিকে, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গঠিত এনসিপি একটি জোটের অংশ হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও তেমন সাফল্য পায়নি।
জামায়াত জোটে সমর্থকদের অসন্তোষ
এনসিপির অনেক সমর্থক দাবি করেছেন, ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গত ডিসেম্বরে নির্বাচনী জোট গঠনই দলটির জনপ্রিয়তা হ্রাসের মূল কারণ। এই সিদ্ধান্তের ফলে তারা মূল রাজনৈতিক লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শুরুতে প্রায় সব আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত এনসিপি মাত্র ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।
নেতাদের ব্যাখ্যা ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
দলটির নেতাদের মতে, ঢাকায় আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য খুন হওয়ার পর নিরাপত্তার খাতিরে বড় একটি দলের ছত্রচ্ছায়ায় যাওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচনের আগে পর্যাপ্ত জনসমর্থন তৈরিতে এনসিপি ব্যর্থ হয়েছে।
তরুণ ভোটারদের প্রতিক্রিয়া
২৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর মানুষের যে স্বপ্ন ছিল, এনসিপি তা পূরণ করতে পারেনি। জামায়াতের সঙ্গে জোট করাটা বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে হয়েছে, তাই তরুণ ভোটাররা তাদের সমর্থন দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।’
বিজয়ী প্রার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি
এনসিপির বিজয়ী ৬ প্রার্থীর একজন আবদুল্লাহ আল আমিন, যিনি পেশায় আইনজীবী এবং দলটির যুগ্ম সদস্যসচিব। তিনি বলেন, আরও অনেক আসনে জয়ের প্রত্যাশা ছিল, তবে কিছু আসনে সামান্য ব্যবধানে পরাজয় ঘটেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের যাত্রা সবে শুরু হয়েছে, এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজপথে বাংলাদেশকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখানো লক্ষ্যেই আমরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে চাই।’
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন সেসব তরুণ ভোটারদের দূরে ঠেলে দিয়েছে, যারা হাসিনার পতনের পর নতুন ধারার রাজনীতি চেয়েছিলেন। তিনি সতর্ক করেন, এনসিপি যদি নিজেদের স্বকীয়তা তৈরি করতে না পারে এবং এই জোট থেকে দূরত্ব বজায় না রাখে, তবে তারা জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্থানীয় নির্বাচনে ফোকাস
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, তারা বিরোধী দলে থেকে নিজেদের পুনর্গঠন করবেন এবং এক বছরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোযোগ দেবেন। পূর্বে নেতা নাহিদ ইসলাম সময়, তহবিল ও ইস্যুভিত্তিক অস্পষ্টতার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীর অভিজ্ঞতা
পরাজিত তরুণ প্রার্থী তাসনিম জারা, যিনি জামায়াত জোটের প্রতিবাদে এনসিপি ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন, বলেন, ‘পরিচ্ছন্ন প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করা সম্ভব, তবে ভয়ভীতি মোকাবেলায় শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা প্রয়োজন।’ তিনি ব্রিটেনে চিকিৎসা পেশায় ফিরে না গিয়ে দেশেই রাজনীতি চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
