নোয়াখালীর হাতিয়ায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা: বাড়িতে হামলা, নারীকে মারধরের অভিযোগ
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় একটি বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, হামলাকারীরা নারীকে মারধর ও শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালিয়েছে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নিঝুমদ্বীপসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
হামলার বিস্তারিত বিবরণ
শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বুড়িরচর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের তালপাতার বাজার সংলগ্ন আলী মাঝির বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। ভুক্তভোগী এরশাদ জানান, বিকালে দোকানে অবস্থানকালে প্রথমে তাকে মারধর করা হয়। পরে মাগরিবের পর একদল লোক তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা টিনের ঘর ভাঙচুর করে, জানালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে শোকেস ভেঙে ফেলে।
তার অভিযোগ, হামলার সময় তার মা মানুজা খাতুনকে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয় এবং তার কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়। ঘরে থাকা প্লেট-বাসনপত্র, একটি বিদেশি কম্বল এবং শোকেসে রাখা দিনমজুরির কিছু নগদ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরশাদ বলেন, "আমি মধু সংগ্রহ ও দিনমজুরির কাজ করে সংসার চালাই। কষ্টের টাকাগুলোও নিয়ে গেছে।"
অভিযুক্তদের পরিচয় ও ভিডিও প্রমাণ
অভিযোগে বলা হয়েছে, হামলায় জড়িতদের মধ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী মো. আলীসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এরশাদের ভাষ্যমতে, অভিযুক্তদের মধ্যে মোহাম্মদ সাদ্দাম, রাসেল, রাশেদ ওরফে মনুন, সাইফুল, শাকিব ও হৃদয়সহ আরও অনেকে ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে তার মা শনাক্ত করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। ভিডিওতে ভাঙচুরের দৃশ্য ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য শোনা যায় বলে দাবি করা হলেও এর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা
এদিকে একই দিনে দুপুরে নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর পরাজয়ের পর তার সমর্থকদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সানা উল্লাহ বলেন, জুমার নামাজের আগে তাদের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালানো হয়। তার ভাষ্য, "আমার বাবা বিএনপি করেন। শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই আমাদের টার্গেট করা হয়েছে।" চেয়ারম্যানঘাট এলাকার দোকানদার মো. আকবরও তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের অভিযোগ করেছেন। এতে তিনি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে জানান।
রাজনৈতিক দাবি ও প্রতিক্রিয়া
তবে অপরপক্ষের দাবি, নির্বাচনের আগে শাপলা কলি প্রতীকের সমর্থকদের ওপর হামলা ও ভোটে বাধা দেওয়ার ঘটনার জেরে বর্তমান উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সমর্থক বলেন, "ভোটের আগে আমাদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছিল। এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে।"
বিএনপির প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীম জানান, তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আহত নেতাকর্মীদের দেখতে গিয়েছেন। তার অভিযোগ, "ধান শীষে ভোট দেওয়ার কারণেই আমাদের কর্মীদের মারধর করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পাচ্ছি।"
অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, "মানুষকে জিম্মি করার দিন শেষ। আমাদের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান—ধৈর্য ধারণ করুন, কোনো উস্কানিতে পা দেবেন না। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ হবে না।" তিনি জানান, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের জনসমাগম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং পূর্বঘোষিত ‘জনতার সঙ্গে নবযাত্রা ও শুভেচ্ছা বিনিময়’ কর্মসূচিও স্থগিত করা হয়েছে।
পুলিশের পদক্ষেপ
হাতিয়া থানার ওসি মো. সাইফুল আলম বলেন, "আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী পুরো উপজেলায় কাজ করছে। কোথাও ঝামেলার খবর পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।"
