নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় বাগেরহাটে হামলা-ভাংচুর, আহত অন্তত ৩৫
বাগেরহাটে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় আহত ৩৫

নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় বাগেরহাট উত্তাল: আহত ৩৫, ভাংচুর ২০ বাড়ি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকায় হামলা-পাল্টা হামলা, ভাংচুর ও সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। ভোট গণনা শেষে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকে শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার সদর, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলায় পাল্টাপাল্টি হামলায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

বাড়িঘর ভাংচুর ও উত্তেজনা

হামলা-পাল্টা হামলায় বাগেরহাট সদর, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় অন্তত ২০টি বসতবাড়ি ভাঙচুর ও তছনছ করেছে প্রতিপক্ষরা। এ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় উভয় পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করা হচ্ছে। হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগে পুলিশ ইতিমধ্যে দুজনকে আটক করেছে।

সদরে পরাজিত ও বিজয়ী প্রার্থীদের সমর্থকদের বাড়িঘর ভাংচুর

বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের মান্দ্রা গ্রামে ওয়ার্ড জামায়াতের সেক্রেটারি কারি মোল্লা, জামায়াত কর্মী জাহাঙ্গীর শেখ, ইয়াকুব আলী হাওলাদার ও মশিউর রহমানসহ ৫-৬ জনের বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গভীর রাতে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল লোক ওই ঘটনা ঘটায়।

এ ঘটনার জেরে শুক্রবার সকালে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিরাজুল ইসলামের বাড়িসহ ৭-৮ বিএনপি কর্মীর বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিএনপির অভিযোগ, জামায়াতের সমর্থক আনোয়ারুল হাওলাদার ও সুমন হাওলাদারের নেতৃত্বে হামলার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ ইমরান ও তারেক নামের দুইজনকে আটক করেছে।

ভোট কম পাওয়ায় চাঁদা দাবি ও মারধর

বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার চন্দ্রপাড়ায় এলাকায় বিএনপি প্রার্থী ভোট কম পাওয়ায় স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি ও না পেয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। আহত অবস্থায় ব্যবসায়ী শেখ আব্দুস সালামকে উদ্ধার করে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আব্দুস সালামের ছেলে নাহিদ হাসান অভ্র বলেন, শুক্রবার সকালে স্থানীয় বাজার থেকে সার কিনে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ফতেপুর বাজারের কাছে একদল সন্ত্রাসী রামদা ও লাঠিসোটা নিয়ে তার বাবার পথ রোধ করে। স্থানীয় বিএনপির সমর্থক শামীম শেখ, আমিন শেখসহ ওই সন্ত্রাসীরা তার বাবার কাছে প্রশ্ন করে, ধানের শীষ কেন্দ্রে ভোট কম পেল কেন। পরে তারা দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং লাঠিসোটা দিয়ে বেধড়ক মারধর করে।

এদিকে কচুয়া উপজেলার গোপালপুর শহীদ আসাদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরে প্রতিপক্ষের মারধরে আসাদ মোল্লা, মোশারেফ শেখ ও শফিক মীর নামে বিএনপির তিন কর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের অভিযোগ, স্বতন্ত্র প্রার্থী এমএএইচ সেলিমের (ঘোড়া প্রতীক) সমর্থক মিজান শেখের নেতৃত্বে কয়েকজন আসাদ মোল্লা ও মোশারেফকে মারধর করে। শরীফ শিকদার ও সজীব শিকদার মারধর করে শফিক মীরকে।

মোরেলগঞ্জ-শরণখোলায় হামলা ও হুমকির অভিযোগ

মোরেলগঞ্জ-শরণখোলায় বিএনপির পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মারধর ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ওই আসনের বিজয়ী প্রার্থী মো. আব্দুল আলীম। তিনি বলেন, দুই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে তাদের নেতাকর্মীদের উপর হামলা, মারধর ও হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটছে, যাতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। তিনি প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

নির্বাচন ফল ও দলীয় প্রতিক্রিয়া

নির্বাচনে জেলার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে বাগেরহাট ১, ২ ও ৪ এই তিনটি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে। আর বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী জয় পেয়েছেন।

বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর, হুমকি-ধমকির অভিযোগ তুলে বাগেরহাট জেলা জামায়াতের আমির মো. রেজাউল করিম বলেন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পরাজিত এবং বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকরা জেলার বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা করছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

অন্যদিকে বাগেরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এটিএম আকরাম হোসেন তালিম বলেন, নির্বাচন হয়ে গেছে, এখন সংঘাতের কোনো কারণ নেই। তিনি সবাইকে শান্ত থাকতে বলেছেন এবং দলের কেউ জড়িত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

পুলিশের বক্তব্য

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. হাসান চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ আসছে এবং ভাঙচুরসহ কিছু বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর আছে এবং যেকোনো অপরাধের বিষয়ে তাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের ধরতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।