ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে আলোচনায় শীর্ষে থেকেও পরাজিত প্রার্থীদের চিত্র
নির্বাচনে আলোচনায় শীর্ষে থেকেও যারা হেরেছেন

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে আলোচনায় শীর্ষে থেকেও পরাজিত প্রার্থীদের চিত্র

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণাকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের সমাবেশ পর্যন্ত সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বেশ কয়েকজন প্রার্থী। তাদের মধ্যে কারো বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে, আবার কারো কর্মকাণ্ড ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। তবে প্রাথমিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই আলোচিত প্রার্থীদের বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী সুবিধা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অনেকেই আলোচনার শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও পরাজয় বরণ করেছেন।

ঢাকা-৮ আসনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর পরাজয়

এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল রাজধানীর ঢাকা-৮ আসন। এ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। প্রচারণার সময় বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় আসেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি মির্জা আব্বাসের সমালোচনা করে এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ভোররাত ৪টার দিকে এ আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। দেশের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ঢাকা-৮ আসনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে মির্জা আব্বাসকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

পঞ্চগড়-১ আসনে সারজিস আলমের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরাজয়

জুলাই যোদ্ধাদের সমন্বয়ক হিসেবে আলোচনায় ছিলেন সারজিস আলম। পঞ্চগড়-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি হেরে গেলেও রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর তিনি বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানান। ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমি ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সম্পাদক সারজিস আলম শাপলাকলি প্রতীকে পান ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট।

ঢাকা-১৩ আসনে মামুনুল হকের টেম্পারিং অভিযোগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ববি হাজ্জাজ এবং ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য সমর্থিত মাওলানা মামুনুল হকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। এ আসনে আলোচনায় ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিশের নেতা মামুনুল হক। আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজ পেয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৮৭টি ভোট। অপরদিকে ৮৬ হাজার ৬৭টি ভোট পেয়েছেন মামুনুল হক। তাদের ভোটের ব্যবধান ২ হাজার ৩২০। যদিও ভোর রাতে মাওলানা মামুনুল হক নির্বাচনের ফলাফল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ তুলেছেন।

অন্যান্য আলোচিত প্রার্থীদের পরাজয়

তাসনীম জারা: জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে ক্লিন ইমেজের অধিকারী এনিসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনীম জারা বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় ছিলেন। তবে জামায়াত জোটে এনসিপি প্রবেশ করায় তিনি পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। ঢাকা-৯ আসনে হাবীবুর রহমানের বিপক্ষে পরাজয় বরণ করেন তাসনীম জারা।

আমিনুল হক: ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন আমিনুল হক। তিনি বিগত সময়ে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে সরব ছিলেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল বাতেনের কাছে তিনি পরাজিত হন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া–ফুলতলা) আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলি আসগারের নিকট ২ হাজার ৭০২ ভোটে পরাজিত হন।

মোহাম্মদ শিশির মনির: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ক্লিন ইমেজ ও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেও হেরে গিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির। বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরীর কাছে তিনি ৩৯ হাজার ৯৩২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

হামিদুর রহমান আজাদ: কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতবদিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আজাদ হেরে গেছেন। তার নিকটতম প্রার্থী আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ ৩৫ হাজার ৬২৮ ভোটের ব্যবধানে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।

জিএম কাদের: রংপুর-৩ আসনে লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জিএম কাদের) পেয়েছেন মাত্র ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট।

মাহমুদুর রহমান মান্না: বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি প্রত্যাশিত ফল করতে পারেননি। কেটলি প্রতীকে তার প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৪২৬। ফলে তিনি জামানত হারিয়েছেন।

হারুনুর রশীদ হারুন: বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি হারুনুর রশীদ হারুনকে হারিয়ে জয় তুলে নিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল।

এভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণার সময় ব্যাপক আলোচনায় থাকা প্রার্থীদের একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারেননি। বিভিন্ন আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পরও তারা ভোটের ব্যবধানে পরাজয় বরণ করেছেন, যা নির্বাচনী রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।