নেত্রকোনার গণভোটে চার আসনে 'হ্যাঁ' ভোটের জয়, এক আসনে 'না' এগিয়ে
নেত্রকোনা জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে অনুষ্ঠিত গণভোটে চারটি আসনে 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে রায় দিয়েছেন অধিকাংশ ভোটার। তবে নেত্রকোনা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী) আসনে 'না' ভোট বেশি পড়েছে। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমান নিজ কার্যালয়ে এই বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন।
বিএনপি-জামায়াতের প্রাধান্য
ঘোষিত ফল অনুযায়ী, পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা বেসরকারি ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া একটি আসনে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী। এই ফলাফল রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আসনভিত্তিক বিস্তারিত ফলাফল
নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর): বিএনপির কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের গোলাম রব্বানী রিকশা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৪৮৮ ভোট। কায়সার কামাল ৭০ হাজার ৮৫৫ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৬ হাজার ১৮২ জন এবং ভোটকেন্দ্র ছিল ১২৫টি। 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬০৫টি, 'না' ভোট পড়েছে ৭৯ হাজার ৮২১টি এবং বাতিল হয়েছে ৪২ হাজার ৭৩০টি।
নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা): বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি চিকিৎসক আনোয়ারুল হক ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৭১ হাজার ৩৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির ফাহিম রহমান খান পাঠান শাপলা কলি প্রতীকে পেয়েছেন ৬৭ হাজার ৩৬৭ ভোট। আনোয়ারুল হক ১ লাখ ৪ হাজার ৩২ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। এ আসনে ভোটার ৫ লাখ দুই হাজার ৪৩৮ জন এবং ভোটকেন্দ্র ১৭৩টি। 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৭৯৩টি, 'না' ভোট পড়েছে ৭৯ হাজার ৭৫২টি এবং বাতিল হয়েছে ৩৬ হাজার ২৬২টি।
নেত্রকোনা-৩ (আটপাড়া-কেন্দুয়া): বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিলালী ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল ঘোড়া প্রতীকে পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৯৬১ ভোট। রফিকুল ইসলাম হিলালী ৪৯ হাজার ৫০৮ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। এ আসনে ভোটার ৪ লাখ ২০ হাজার ৬৮৭ জন এবং ভোটকেন্দ্র ১৫০টি। 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫টি, 'না' ভোট পড়েছে ৬০ হাজার ৭৮৭টি এবং বাতিল হয়েছে ৪১ হাজার ৫৬৬টি।
নেত্রকোনা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী): এই আসনে 'হ্যাঁ'-র চেয়ে 'না' ভোট বেশি পড়েছে, যা অন্যান্য আসনের চিত্র থেকে ভিন্ন। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৬০ হাজার ৮০১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আল হেলাল তালুকদার দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৮৪০ ভোট। লুৎফুজ্জামান বাবর ১ লাখ ২০ হাজার ৯৬১ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৩১২ জন এবং ভোটকেন্দ্র ১৫০টি। 'না' ভোট পড়েছে ১ লাখ দুই হাজার ১১৩টি, 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ৮২ হাজার ১২৫টি এবং বাতিল হয়েছে ২৭ হাজার ৯৭২টি।
নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা): এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাছুম মোস্তফা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৮২ হাজার ১৭৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী আবু তাহের তালুকদার ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৪১২ ভোট। তাদের মধ্যে ভোটের ব্যবধান মাত্র ২ হাজার ৭৬৫টি। এখানে মোট ভোটার ২ লাখ ৯০ হাজার ১১৭ জন এবং ভোটকেন্দ্র ৮৩টি। 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ৬৭১টি, 'না' ভোট পড়েছে ৪৪ হাজার ৫৭৩টি এবং বাতিল হয়েছে ২৩ হাজার ৭২০টি।
ভোটের শতকরা হার বিশ্লেষণ
নেত্রকোনার গণভোটে ভোটের শতকরা হার উল্লেখযোগ্য বৈচিত্র্য প্রদর্শন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, নেত্রকোনা-১ আসনে 'হ্যাঁ' ভোটের হার ৩০.১৬%, 'না' ভোটের হার ১৭.৫০% এবং বাতিল ভোটের হার ৯.৩৭%। নেত্রকোনা-২ আসনে 'হ্যাঁ' ভোটের হার ৩০.৬১%, 'না' ভোটের হার ১৫.৮৭% এবং বাতিল ভোটের হার ৭.২২%। নেত্রকোনা-৩ আসনে 'হ্যাঁ' ভোটের হার ৩২.৩৩%, 'না' ভোটের হার ১৪.৪৫% এবং বাতিল ভোটের হার ৯.৮৮%। নেত্রকোনা-৪ আসনে 'না' ভোটের হার ২৭.২১%, 'হ্যাঁ' ভোটের হার ২১.৮৮% এবং বাতিল ভোটের হার ৭.৪৫%। নেত্রকোনা-৫ আসনে 'হ্যাঁ' ভোটের হার ৩৪.৭০%, 'না' ভোটের হার ১৫.৩৬% এবং বাতিল ভোটের হার ৮.১৮%।
এই ফলাফল নেত্রকোনা জেলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং ভবিষ্যত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই গণভোটের ফলাফল স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
