ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানার ঐতিহাসিক বিজয়: সাধারণ মানুষের জয়গান
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল বিশ্বরোড থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠে বসলেন সাংবাদিকরা। গন্তব্য ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানার বাসভবন। সিএনজিচালক আবদুল ফারুকের মুখে খুশির ঝিলিক, কারণ তিনি রুমিন ফারহানার বড় বিজয়ে অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি জানান, আজ তিনি গাড়ি চালাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কিন্তু রুমিনের বাসায় যাওয়ার প্রস্তাবে খুশি মনে রাজি হয়েছেন।
সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন
আবদুল ফারুক জীবনে কখনো রাজনীতি না করলেও নিজের ভালো লাগা থেকেই রুমিন ফারহানার জন্য ভোট চেয়েছেন। তিনি সিএনজির যাত্রী ও চালকদের মধ্যে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন। তাঁর উদ্যোগে নাসিরনগর উপজেলার এক ব্যক্তি রুমিনকে নির্বাচনী খরচের জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেন। ফারুকের দৈনিক রোজগার ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, যার মধ্যে গাড়ির মালিককে ৫০০ টাকা জমা দিতে হয়।
বিজয়ী রুমিন ফারহানাকে অভিনন্দন
বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী রুমিন ফারহানাকে অভিনন্দন জানাতে বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁর বাসভবনে জড়ো হতে শুরু করেন নেতা-কর্মীরা। এই নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে চারটি প্রধান কারণ, যা রুমিন ফারহানার বড় জয় নিশ্চিত করেছে।
জয়ের চারটি মূল কারণ
- সৎ ও সাহসী নেতৃত্ব: সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ভোটারদের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছেন রুমিন ফারহানা। নির্বাচনী প্রচারে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
- বিএনপির দুঃসময়ের কান্ডারি: দলের স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের আস্থা অর্জন করেন তিনি। দল মনোনয়ন না দিলেও স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন, ফলে মাঠপর্যায়ের বড় একটি অংশ তাঁর পক্ষে কাজ করেন।
- আওয়ামী লীগের নীরব সমর্থন: গত দেড় বছরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা হয়রানিমূলক মামলায় এলাকাছাড়া। বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকায় রুমিন ফারহানা নীরব সমর্থন পেয়েছেন।
- উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি: বিএনপি জোটের প্রার্থীর বিপরীতে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, গ্যাস-সংযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রুমিন ফারহানা, যা ভোটারদের আশাবাদী করেছে।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান ও পটভূমি
সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৮ জন। নয়জন প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা (হাঁস প্রতীক) ও বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের (খেজুরগাছ প্রতীক) মধ্যে। হাঁস প্রতীক পেয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট, আর খেজুরগাছ প্রতীক পেয়েছে ৮০ হাজার ৪৩৪ ভোট।
রুমিন ফারহানার রাজনৈতিক যাত্রা
রুমিন ফারহানা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ২০১৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হন। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল মনোনয়ন না দিলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন, ফলে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। শাহবাজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুন্সি আমান মিয়া বলেন, মাঠপর্যায়ের ৬০ শতাংশ নেতা-কর্মী হাঁসের পক্ষে কাজ করেছেন, কারণ রুমিন ফারহানা দলের দুঃসময়ের কান্ডারি ছিলেন।
নারী ভোটারদের ভূমিকা
রুমিন ফারহানা জানান, তাঁর জয়ের পেছনে নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল। অনেক নারী ভোটার স্বামীর বিপরীতে তাঁকে ভোট দিয়েছেন। তিনি নারী ভোটারদের আশ্বাস দিয়েছেন, তাঁরা সহজে তাঁর কাছে আসতে পারবেন এবং সমস্যা জানাতে পারবেন। নির্বাচনী প্রচারে গত দুই সপ্তাহে প্রায় ৪০টি সভা করেন তিনি, যেখানে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা গেছে।
প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, প্রশাসন শুরু থেকে তাঁর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে এবং বিএনপি জোটের প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করেছিল। তবে সেনাবাহিনীর কার্যকর ভূমিকা ও পুলিশের সহযোগিতায় তিনি ভোট করতে পেরেছেন বলে উল্লেখ করেন।
রুমিন ফারহানার বাবা ভাষাসংগ্রামী অলি আহাদও ১৯৭৩ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন, যা তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে শক্তিশালী করে। এই বিজয় কেবল একটি আসনের জয় নয়, বরং সাধারণ মানুষের আস্থা ও সমর্থনের প্রতিফলন।
