গণতন্ত্রের ট্রেনে উঠেছে বাংলাদেশ? নির্বাচনের রাতের গুজব থেকে উৎসবে রূপান্তর
নির্বাচনের রাতের গুজব থেকে উৎসবে রূপান্তরের গল্প

নির্বাচনের রাত: গুজব আর উদ্বেগের ছায়া

নির্বাচনের আগের দিন বুধবার রাতটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। সন্ধ্যা নামার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে নানা ধরনের গুজব ও অস্থিরতা সৃষ্টিকারী তথ্য। ভোটকেন্দ্র দখলের খবর, সিলসহ ব্যালটবাক্সের ভুল ছবি প্রকাশ—এসব মিলিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছিল চাপা উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ। রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এই প্রশ্ন: আগের রাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ভোটের দিন সবকিছু ঠিকভাবে পরিচালিত হবে তো?

সকালের পরিবর্তন: গুজবের আবহ কাটিয়ে উৎসবের মুখ

কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে চিত্রটি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। সকাল সাড়ে সাতটায় শুরু হতে যাওয়া ভোটের জন্য লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন ভোটাররা সাতটার আগেই। দুপুর বারোটার দিকে নির্বাচন কমিশন থেকে ঘোষণা করা হয় যে ইতিমধ্যেই ৩২ শতাংশ ভোট পড়েছে। সারাদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোটদানের ছবি শেয়ার করা হতে থাকে, শান্তিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানানো হতে থাকে। কীভাবে আগের রাতের গুজবের আবহ উৎসবে রূপান্তরিত হলো—এই প্রশ্নের উত্তরে ভোটার, প্রার্থী ও বিশ্লেষকরা একবাক্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতিকেই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও নারী ভোটারের উপস্থিতি

বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কথা। নির্বাচন শুরুর পর মিরপুরের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, যত ছোট কেন্দ্রই হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেখানে উপস্থিত আছেন। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "বিএনপি দলীয় সমর্থকরা বিভিন্ন জায়গায় কেন্দ্র দখল করেছে। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সেসব কেন্দ্র দখলমুক্ত করেছে সেনাবাহিনী। দেশজুড়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রশংসনীয়।"

যে নারী ভোটারদের এই নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব রাখবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ঢাকা-৮ আসনের ভোটার ব্যাংক কর্মকর্তা জেসমিন বলেন, "কাল রাতে ভেবেছিলাম ভোট দেবো না। সকাল থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলাম। আসলে বুধবার রাতে গুজব ও রাজনৈতিক নেতাদের পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা শঙ্কাকে বাড়িয়ে তুলেছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার দুপুরে খেয়াল করে দেখলাম, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। দুপুরের পর তাই কেন্দ্রে এসেছি।"

জেনজি ভোটারদের দৃশ্যমানতা: কম থাকার কারণ

নির্বাচনের দিন সকাল থেকে ভোটের কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়লেও ভোটের তারতম্যের মূল ফ্যাক্টর জেনজি বা তরুণ প্রজন্মের দৃশ্যমানতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বুথের সামনে লাইনে দাঁড়ানো ভোটারদের বড় অংশই ছিল মধ্যবয়সী ও প্রবীণ। জুলাই আন্দোলনের পর নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে যে তরুণদের উচ্ছাস, সে কারণে তাদের দৃশ্যমানতা আরও বেশি থাকবে বলে আশা করা হয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, গত দেড় বছরে রাজনৈতিক অনাগ্রহ ও হতাশা কাজ করতে দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে। তারা মনে করেন, নির্বাচনের ফলাফল বা প্রক্রিয়ায় তাদের ভোটের প্রভাব সীমিত। আবার ডিজিটাল সক্রিয়তা তাদের যতটা বেশি সবসময়, বাস্তব অংশগ্রহণ কমই দেখা যায়। আগের রাতের অস্থিরতার কারণেও কিছু উপস্থিতি কম হয়ে থাকতে পারে। ভোট দিতে আসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, "ছুটির কারণে বড় অংশ দেশের বাড়ি গেছে, হয়তো ভোটটা তার ঢাকায়। আবার আমার বন্ধুদের অনেকে আসতে আগ্রহ দেখা যায়নি, পছন্দের প্রার্থী নেই তার আসনে। এসব মিলিয়ে কম হয়ে থাকতে পারে।"

ধন্যবাদ বাংলাদেশ: শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রশংসা

নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষে বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, "ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, প্রার্থীদের সংযম ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের পেশাদারী—এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই প্রমাণ করেছে, গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অটুট।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমি নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, পর্যবেক্ষক দল, গণমাধ্যমকর্মী এবং ভোট গ্রহণে সম্পৃক্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।"

এদিকে, প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম ভোটগ্রহণের সময় শেষে ফেসবুক পোস্টে লেখেন, "থ্যাংক ইউ বাংলাদেশ! বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। একইসঙ্গে সবচেয়ে উৎসবমুখর ভোটও!!"

গণতন্ত্রের ট্রেনে উঠেছে বাংলাদেশ?

সকালে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চবিদ্যালয়ে ভোট দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। ভোট দেওয়া শেষে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। নাসির উদ্দীন বলেন, "আজকের ঐতিহাসিক ভোটগ্রহণের দিনের শুভ সূচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্রায়ণের ট্রেনে উঠে গেছে।"

কিন্তু আসলেই কি বাংলাদেশ গণতন্ত্রায়ণের ট্রেনে উঠে গেছে? এই প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, "গণতন্ত্রের ট্রেনে উঠে গেছে সেটা না বললেও, বলা যায়—গণতন্ত্রের ট্রেনের টিকিট কেটেছে। গণতন্ত্র আরও বড় ব্যাপার—বিচার বিভাগ, সংসদ, এই প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় করার মধ্য দিয়ে আইনের শাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ট্রেনে উঠে পড়ার কথা বলা যাবে না। বরং বলা দরকার, নির্বাচন সেই পথের প্রথম ও প্রধান ধাপ। সেটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা গেছে।"

উল্লেখ্য, একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে এবার শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন বাতিল করা হয়। ২৯৯টি আসনে এবারের নির্বাচনে ইসিতে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি দল অংশ নেয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে ইসি। ফলে দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।