কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ভোটের উৎসব: তরুণ-নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে গণতন্ত্রের জোয়ার
কুড়িগ্রামে ভোটের উৎসব: তরুণ-নারীদের অংশগ্রহণে গণতন্ত্রের জোয়ার

কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ভোটের উৎসব: তরুণ-নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ

কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলায় চারটি ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি। তরুণ এবং নারীদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। গতকাল বৃহস্পতিবার মাঘ মাসের ২৯ তারিখে ভোটকেন্দ্রগুলোতে যেন ভোটের বসন্ত নেমেছে। সকাল ১০টার দিকে রাজারহাট ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে একটি অটোরিকশায় করে যাওয়া হয়। রিকশা থেকে নামার আগে আসমা নামের এক মহিলার কথা শোনা যায়, যিনি প্রথমে ভোটদানে বাধাপ্রাপ্ত হলেও পরে সফল হন।

তরুণ ভোটারদের উদ্দীপনা

রিকশার পাশে দাঁড়ানো কয়েকজন তরুণ ভোটার প্রত্যেকে প্রথমবার ভোট দিতে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছেন, কেউ উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন, আবার কেউ স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী লিমন বলেন, ‘জীবনে প্রথমবার ভোট দেব, এটা ভেবে গত রাতে ঘুমই হয়নি।’ তিনি মোবাইলে অ্যাপ ব্যবহার করে অন্যের ভোটার নম্বর বলে দিচ্ছিলেন। রিকশাওয়ালা মকবুল হোসেনও তাঁর ভোটার নম্বর জেনে নেন।

শান্তিপূর্ণ ভোট পরিবেশ

প্রায় বেলা ১১টার দিকে পুনকর সৌদাময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় নারী-পুরুষ সব ধরনের ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পুনিল চন্দ্র এবং স্কুলশিক্ষক তাপসের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় ভোট ভীষণ শান্তিপূর্ণ। কোনো ভীতি বা শঙ্কা ছাড়াই সবাই ভোট দিতে আসছেন। ঢাকা থেকে একজন ভোটার শুধুমাত্র ভোট দিতেই এসেছেন বলে জানান।

নারী ভোটারদের সক্রিয়তা

দুপুর ১২টার দিকে হরিশ্বর তালুক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট প্রয়োগ করছেন। এই কেন্দ্রে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। নারীরা বাড়িতে সকালে ভাত রান্না করে পরিবারের সদস্যদের খাওয়ানোর পর ভোট দিতে এসেছেন বলে জানা যায়।

গত নির্বাচনের তুলনায় পরিবর্তন

গত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন কার্যত একপেশে ছিল। ২০১৪ সালে ভোটের আগেই বিনা ভোটে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট সরকার গায়ের জোরে ভোট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনও সাজানো ছিল বলে মনে করা হয়। ফলে সেই নির্বাচনগুলো উৎসবমুখর হয়নি।

বর্তমান ভোটের ইতিবাচক দিক

আজ ভোটকেন্দ্রগুলোতে মহিলাদের দুটি বড় লাইন এবং কেন্দ্রের বাইরে লোকসমাগম দেখা গেছে। বিভিন্ন দলীয় বুথ ভোটারদের সহায়তা করছে। ভোটাররা ভোটের পরিবেশ নিয়ে খুব খুশি বলে জানান। ধানের শীষ এবং শাপলা কলি মার্কার দিকে মানুষের ঝোঁক বেশি মনে হলেও জয়-পরাজয়ের বাস্তবতা আরও কয়েক ঘণ্টা পরে জানা যাবে।

উৎসবের আমেজ

ভোটকেন্দ্রগুলোতে এক দিনের জন্য চায়ের দোকান বসেছে, যেখানে পাউরুটি, বিস্কুট, বিড়ি-সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। অনেকে চা খাচ্ছেন এবং আড্ডা দিচ্ছেন। ভোট উপলক্ষে বাইরে থেকে আসা লোকেরা ছোট ছোট জটলা করছেন। ভোটকেন্দ্রগুলো ঈদ বা পূজার মতো উৎসবের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

উৎসবপ্রিয় বাঙালির কাছে ভোট প্রদান উৎসবে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণমানুষের মধ্যে দেশ নিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, এবারের ভোটে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলে দেশ আর পথ হারাবে না। ভোটে জয়-পরাজয় একপক্ষের হবে, সেটাই স্বাভাবিক। মানুষ যেভাবে উৎসবের আমেজে ভোট দিয়েছেন, তাতে গণতন্ত্র রক্ষায় তারা সজাগ ও সচেতন বলে বার্তা পাওয়া গেছে। ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত থাকুক।