পুরান ঢাকায় ২০২৬ নির্বাচনে ভোটারদের উৎসবমুখর দিন: সেলফি ও প্রত্যাশার ছবি
পুরান ঢাকায় নির্বাচন: ভোটারদের উৎসবমুখর দিন

পুরান ঢাকায় ২০২৬ নির্বাচনে ভোটারদের উৎসবমুখর দিন: সেলফি ও প্রত্যাশার ছবি

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে পুরান ঢাকার সরু গলি, পুরোনো দালান, মসলার গন্ধমাখা চকবাজার এবং বুড়িগঙ্গার হাওয়ায় যেন এক উৎসবের আবহ বিরাজ করছিল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ওয়ারী, ধোলাইখাল, বংশাল-টিকাটুলী, নয়াবাজার-বেগমবাজার, সিদ্দিকবাজার, নাজিরাবাজার, আলুবাজার, নবাবপুর, চকবাজার-লালবাগ এবং কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা ও উদ্দীপনা কাজ করছে। তরুণ-তরুণীরা একসঙ্গে এসে ভোট দিয়ে সেলফি তুলছেন, কেন্দ্রের বাইরে আড্ডা দিচ্ছেন, আর প্রবীণ দম্পতিরা ধৈর্য ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। অনেকের কণ্ঠেই একই প্রত্যাশা ধ্বনিত হয়েছে—‘একটা নির্বাচিত সরকার আসুক, গণতন্ত্র ফিরে পাক।’

সকালের ছোট্ট বিপত্তি ও সমাধান

সকাল সাড়ে আটটায় ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির প্রার্থী হামিদুর রহমানকে দেখা গেছে বংশালের আগাসাদেক রোডের আইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। সরু গলির ভেতরে অবস্থিত এই ছোট্ট স্কুলে রিকশাও ঠিকমতো ঢুকতে পারে না। হামিদুর রহমান ফুরফুরে মেজাজে এলেও শুরুতেই একটি বিড়ম্বনার সম্মুখীন হন। অনলাইনে দেখা ভোটার নম্বর অনুযায়ী কেন্দ্রে এসে তিনি দেখেন, তালিকায় তাঁর নাম নেই। কিছুটা উৎকণ্ঠা ও অস্বস্তি সত্ত্বেও তিনি বিরক্তির প্রকাশ না করে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। পরে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সহায়তায় সমস্যার সমাধান হয় এবং সকাল ৯টা ২০ মিনিটে তিনি ভোট দিয়ে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সামনে ‘ভি’ চিহ্ন দেখান। ভোট শেষে হামিদুর রহমান বলেন, ‘১৭ বছর পর স্বাধীন চিত্তে ভোট দিলাম। ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না—এত সুন্দর পরিবেশ। সবাই ভোট দিতে আসেন।’ বেলা একটা নাগাদ আরমানিটোলা হাইস্কুলে আবার দেখা যায় তাঁকে, তখন পর্যন্ত তিনি কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরেছেন এবং মুখে সন্তুষ্টির হাসি নিয়ে বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত ভালো ভোট হয়েছে।’

আক্ষেপের অবসান ও প্রবীণদের তৃপ্তি

আরমানিটোলা হাইস্কুল কেন্দ্রে মোহাম্মদ মুসা রিকশায় করে এসেছেন, যাঁর হাঁটার মতো অবস্থা নেই। রিকশা থেকে নেমে দুই তরুণের কাঁধে ভর করে ভেতরে ঢুকে তিনি আঞ্চলিক ভাষায় বলেছেন, ‘১৭ বছর ভোট দিবার পারি নাইক্কা। স্কুলের গেটে আইলে কয়, দেওয়া অইয়া গেছে, যান গা। আজ আইসি ভোট দিবার—খুব খুশি লাগতাছে।’ তাঁর চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির ছাপ। একই কেন্দ্রে রেহানা বেগম (৬০) বলেছেন, ‘ভোট না দিলে নাগরিকের দায় পূরণ হয় না। আগেরবার কষ্ট পেয়েছিলাম। আজ অন্তত নিজের ভোটটা নিজে দিলাম।’ জুবায়ের রহমান তাওহীদ সপরিবারে এসেছেন, কোলে শিশু নিয়ে তিনি হাসতে হাসতে বলেছেন, ‘ভোটটা আমাদের কাছে উৎসব মনে হচ্ছে। বাচ্চাকে দেখাচ্ছি—এটাই আমাদের অধিকার।’ ৬৫ বছরের মোহাম্মদ শাহজাহান ক্রাচে ভর করে কেন্দ্রে এসে বলেছেন, ‘পরিবেশটাই ভালো লাগছে। শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ থাকলেই হয়।’ আরমানিটোলা স্কুলের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল ফজল জানিয়েছেন, ‘সকালটা ভোটারের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বেড়েছে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রায় ২০ শতাংশ ভোট পড়েছে। আশা করছি, বিকেলে আরও বাড়বে।’

লালবাগে হাত ধরা পথচলা ও আলোচনা

লালবাগ কেল্লার পাশের রহমতুল্লা মডেল হাইস্কুলে দেখা গেছে প্রবীণ এক দম্পতিকে, যাঁরা রিকশা থেকে নামার সময় হাত ধরাধরি করেছেন। স্ত্রীকে নারীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে স্বামী নিজেও লাইনে দাঁড়িয়েছেন এবং বলেছেন, ‘ভোট দেওয়া আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। এখন ভালোভাবে সব সম্পন্ন হলেই হয়।’ কেন্দ্রের সামনে চায়ের দোকানে কয়েকজন মধ্য বয়সী ভোটার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে আলোচনা করছিলেন, যেখানে একজনের মন্তব্য ছিল, ‘এবার প্রতিযোগিতা আছে। মানুষ ভোট দিতে পারলে ফলও ঠিকঠাক হবে।’

ধীরগতি তবু স্বতঃস্ফূর্ততা

কামরাঙ্গীরচরে নারী-পুরুষের উপস্থিতি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, তবে কেউ কেউ জানিয়েছেন যে ভোট গ্রহণের গতি কিছুটা ধীর। কেন্দ্রে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন এবং বাইরে রাস্তায় সেনাবাহিনীর গাড়ির টহল দেখা গেছে। ৬৬ বছরের মনোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘এত সুন্দর ভোট আগে দেখি নাই। যে জিতবে—হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হইবো। লড়াই থাকলে ভোটের দাম থাকে।’ এক তরুণী ভোটার, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেছেন, ‘লাইনে সময় লেগেছে। কিন্তু নিরাপদ লাগছে। সেটাই বড় কথা।’

প্রথম ভোটের উত্তেজনা

বেগমবাজারের হলিহার্ট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে দেখা গেছে বরকাতুল আলিফকে, যিনি নতুন পাঞ্জাবি পরে এসেছেন মা–বাবা ও বোনকে নিয়ে। তাঁর মা নাসরিন আক্তারও ভোট উপলক্ষে নতুন পোশাক পরেছেন। প্রথম ভোট দিয়ে উচ্ছ্বসিত আলিফ বলেছেন, ‘আঙ্কেল, একটা ভাব আছে না—প্রথমবার ভোট দিচ্ছি! নতুন জামা কিনছি। সারা রাত ঘুম হয় নাই।’ তাঁর বাবা এনায়েত করিম যোগ করেছেন, ‘আমরা চাই নিয়মিত ভোট হোক। তাহলে রাজনীতি নিয়ে হতাশা কমবে। গণতান্ত্রিক সরকার আসুক, ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হোক—এই প্রত্যাশা।’ সকালে বয়স্ক নারীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, আর দুপুর গড়াতেই তরুণদের ভিড় বেড়েছে। সেলফি, আড্ডা, চায়ের দোকানে আলোচনা—সব মিলিয়ে একধরনের মিলনমেলার আবহ তৈরি হয়েছে।

ফলাফলের অপেক্ষায় শহর

দিনভর পুরান ঢাকার বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ভোটারদের মধ্যে স্বস্তি ও প্রত্যাশা কাজ করছে। কেউ বলছেন, ‘এবার যেন নিয়মিত নির্বাচন হয়।’ কেউ বলছেন, ‘ফল যা–ই হোক, ভোটের অধিকারটা যেন থাকে।’ ১৭ বছর পর ভোট দিতে পেরে কারও চোখে জল, কারও মুখে হাসি। কেউ বন্ধু নিয়ে, কেউ স্ত্রী-সন্তান নিয়ে, কেউ ক্রাচে ভর দিয়ে—সবাই যেন এক স্রোতে মিশে গেছেন। বিকেল পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ শেষ হলে সবার চোখ থাকবে ফলাফলের দিকে। পুরান ঢাকার সরু গলি যেন দিনের শেষে একটাই কথাই বলছে—ভোট শুধু ব্যালটে ছাপ নয়, তা অধিকার ও প্রত্যাশারও প্রকাশ।