বয়সের বাধা উপেক্ষা করে ভোট দিচ্ছেন প্রবীণরা, নীলফামারীতে গণতন্ত্রের অনন্য দৃষ্টান্ত
বয়সের বাধা উপেক্ষা করে ভোট দিচ্ছেন প্রবীণরা

বয়সের বাধা উপেক্ষা করে ভোট দিচ্ছেন প্রবীণরা, নীলফামারীতে গণতন্ত্রের অনন্য দৃষ্টান্ত

ভোটাধিকার কেবল সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি একটি নাগরিক দায়িত্ব—এই সত্যটি আবারও প্রমাণ করলেন নীলফামারী-৪ আসনের বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটাররা। শারীরিক অক্ষমতা ও বার্ধক্যজনিত দুর্বলতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তারা ভোটকেন্দ্রে হাজির হচ্ছেন, গণতন্ত্রের প্রতি তাদের অগাধ আস্থা ও দায়বদ্ধতার পরিচয় দিচ্ছেন।

৯০ বছরের নাজমা বেগমের অনন্য সংগ্রাম

সৈয়দপুরের ৯০ বছর বয়সি নাজমা বেগমের কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শারীরিক অক্ষমতা ও বয়সজনিত দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি সকাল সকাল ভোট দিতে কেন্দ্রে উপস্থিত হন। দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা ও বয়সের ভার তাকে দমাতে পারেনি। নিজ উদ্যোগে অন্যের কাঁধে ভর করে তিনি ভোটকেন্দ্রে পৌঁছান এবং তার মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করেন।

ভোট দিয়ে বেরিয়ে নাজমা বেগম বলেন, "বিগত ১৭ বছর ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত ছিলাম। ভোট দেওয়া আমার অধিকার। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছি। আমি চাই ভালো মানুষের দ্বারা আবার বাংলাদেশ 'সোনার বাংলা' হয়ে উঠুক।" তার এই উক্তি শুধু ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং একটি জাতির সমষ্টিগত আশার প্রতিফলন।

৭২ বছরের আবু বক্কর ও ১০৬ বছরের জালাল উদ্দীনের দৃষ্টান্ত

শহরের নতুন বাবুপাড়া এলাকার ৭২ বছর বয়সি আবু বক্কর হাঁটতে না পারলেও আমিনুল ইসলাম নামের এক আনসার সদস্যের কাঁধে ভর করে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন। দুর্বল হাত-পা ও শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তার চোখে-মুখে ছিল হাসির ঝিলিক। দীর্ঘদিন পর পছন্দের দল ও প্রার্থীকে ভোট দিয়ে তিনি গভীর তৃপ্তি অনুভব করেন।

এছাড়া শহরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ১০৬ বছর বয়সি জালাল উদ্দীন মানসিক ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে দারুলউলুম মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট দেন। তিনি বলেন, "একটি মাত্র ছেলে আমার। ছেলে ও বউমা বাধা দিচ্ছিল ভোটকেন্দ্রে আসতে। কিন্তু আমি তাদের বাধা উপেক্ষা করে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছি এবং ভোট দিয়েছি।" পরিবারের বাধা উপেক্ষা করে গণতন্ত্রের ডাকে সাড়া দেওয়া তার এই সিদ্ধান্ত প্রবীণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া

ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত নির্বাচন কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, "বয়স্কদের কেন্দ্রে এসে ভোট দেওয়াটা সবাইকে অবাক করেছে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তারা ভোট দিতে এসেছেন, এটা গণতন্ত্রের প্রতি তাদের গভীর দায়বদ্ধতার প্রমাণ।"

সৈয়দপুর সরকারি কলেজ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান আরও ব্যাখ্যা করেন, "প্রবীণ ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে উপস্থিতি আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থাকে মর্যাদাবান করেছে। শারীরিক অক্ষমতা ও বয়সজনিত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তারা ভোট দিতে এসেছেন, এটা শুধু দায়িত্ববোধ নয়, এটি গণতন্ত্রের প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধা ও সচেতনতার প্রকাশ। আমরা তাদের সর্বোচ্চ সম্মান ও সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।"

তিনি আরও জানান, সৈয়দপুরের সব ভোটকেন্দ্রেই শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের এই প্রক্রিয়া নীলফামারীতে গণতন্ত্রের একটি জীবন্ত উদাহরণ তৈরি করেছে।

গণতন্ত্রের মর্মবাণী

এই ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে ভোটাধিকার শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও দায়িত্বের প্রতীক। প্রবীণ ভোটারদের এই অদম্য আগ্রহ ও সংকল্প নিম্নলিখিত বিষয়গুলো তুলে ধরে:

  • গণতন্ত্রের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা
  • নাগরিক দায়িত্ব পালনের অকুণ্ঠ ইচ্ছা
  • শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করার মানসিক শক্তি
  • রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের গুরুত্ব

নীলফামারী-৪ আসনের প্রবীণ ভোটাররা শুধু ভোটই দিচ্ছেন না, তারা একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। তাদের এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যা প্রমাণ করে যে বয়স বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো গণতন্ত্রের ডাকে সাড়া দেওয়ার পথে বাধা হতে পারে না।