১৭ বছর পর হুইলচেয়ারে চেপে ভোট দিলেন ৮০ বছরের আবদুল্লাহ
বয়স কিংবা শারীরিক অক্ষমতা কখনোই গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না— এই সত্যের জীবন্ত প্রমাণ হয়ে উঠেছেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার ৮০ বছর বয়সী মো. আবদুল্লাহ। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ভোট দিতে না পারার গভীর আক্ষেপ বুকে নিয়ে থাকা এই প্রবীণ নাগরিক অবশেষে হুইলচেয়ারে ভর করে ভোটকেন্দ্রে হাজির হয়ে নিজের মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা সমগ্র সমাজের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছে।
পরিবারের সহযোগিতায় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি
বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সকাল আটটার দিকে পরিবারের সদস্যদের অক্লান্ত সহযোগিতায় চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ সুফিয়া আলিয়া মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে আবদুল্লাহ তার ভোটাধিকার সফলভাবে প্রয়োগ করেন। তিনি চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের কিল্লার আন্দর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এবং চট্টগ্রাম–১৫ (লোহাগাড়া–সাতকানিয়া আংশিক) সংসদীয় আসনের একজন নিবন্ধিত ভোটার হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করেছেন।
বহু বছর ধরে পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে অক্ষম এই প্রবীণ নাগরিকের চলাফেরার একমাত্র ভরসা হলো হুইলচেয়ার। তবুও পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় ভোট দিয়ে বের হওয়ার সময় তার মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত ছিল অপরিসীম তৃপ্তি ও আনন্দের হাসিতে, যা গণতন্ত্রের প্রতি তার অটুট আস্থা ও প্রত্যয়েরই স্বাক্ষর বহন করে।
আবদুল্লাহর অনুভূতি ও প্রত্যাশা
ভোট প্রদানের পর আবদুল্লাহ সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানান, “অনেক বছর পর আজ এমন উৎসবমুখর ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে ভোট দিতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং গর্বিত বোধ করছি। আমি আমার বিবেকের নির্দেশনা অনুসারে যোগ্য প্রার্থীর পক্ষেই রায় দিয়েছি। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে হুইলচেয়ারের সহায়তা নিয়ে আসতে হয়েছে, কিন্তু ভোট দেওয়ার এই সুযোগ আমি কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চাইনি। আমি দৃঢ়ভাবে আশা করি, যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি আমাদের এলাকার উন্নয়নমূলক দাবিগুলো পূরণে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন এবং জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন।”
আসনের প্রার্থী ও ভোটারদের ধারণা
চট্টগ্রাম–১৫ আসনে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনজন প্রধান প্রার্থী:
- বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের নাজমুল মোস্তফা আমিন
- জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের শাহজাহান চৌধুরী
- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের শরীফুল আলম চৌধুরী
স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ধারণা হলো, এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সংঘটিত হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীদের মধ্যেই, যা নির্বাচনী পরিবেশকে আরো উত্তেজনাপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।
ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও পরিসংখ্যান
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম–১৫ আসনে মোট নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ৫ লাখ ৬ হাজার ৫৯ জন। এই সংসদীয় আসনটি গঠিত হয়েছে ২০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে, যেখানে মোট ১৫৭টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিষ্পাপ রাখতে এই সকল ভোটকেন্দ্রই সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় রয়েছে।
আমিরাবাদ সুফিয়া আলিয়া মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নবী হোছাইন জানিয়েছেন, এই কেন্দ্রটি আসনের বৃহত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। সকাল সাড়ে সাতটায় সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও অনুকূল পরিবেশে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই কেন্দ্রে মোট ১০টি ভোটিং বুথ স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ৫ হাজার ৬৪৪ জন নিবন্ধিত ভোটার তাদের মূল্যবান ভোট প্রদান করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই গুরুত্বপূর্ণ দিনে ৮০ বছর বয়সী আবদুল্লাহর এই অনন্য অবদান শুধুমাত্র একটি ভোটই নয়, বরং গণতন্ত্রের প্রতি অগাধ আস্থা ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। তার এই সংগ্রাম ও অধ্যবসায় যুবসমাজসহ সকল নাগরিককে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের পাঠ শেখাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।
