বাংলাদেশে ইসলামপন্থী জোটের উত্থান: গণতন্ত্রের পথে নতুন চ্যালেঞ্জ ও ভোটারদের সতর্কতা
ইসলামপন্থী জোটের উত্থান: গণতন্ত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে ইসলামপন্থী জোটের উত্থান: গণতন্ত্রের পথে নতুন চ্যালেঞ্জ

শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের সময় দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। মানুষ সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছিল যে, কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনে জয়লাভ করে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে একটি মাফিয়াতন্ত্রে রূপান্তরিত করেছিল। যেহেতু দেশে প্রকৃত নির্বাচনের অভাব ছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল এই বিষয়ে যে, একটি সত্যিকারের নির্বাচনই আমাদের গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই কথাটি অর্ধসত্য, পুরোপুরি সত্য নয়। তবে একটি মাফিয়াতন্ত্রের প্রেক্ষাপটে কেন এটি অর্ধসত্য, সেই আলোচনার সুযোগ তখন সীমিত ছিল; যা এখন আমরা করতে পারি এবং এই আলোচনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

নির্বাচনে ইসলামপন্থী জোটের অভিনব উপস্থিতি

দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে একটি উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচন মানেই অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া; কিন্তু আমাদের মতো দেশে ‘হাসিনা মার্কা’ নির্বাচনের কারণে এই শব্দগুলো নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা লক্ষণীয়। এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশে একেবারে অভিনব একটি ঘটনা ঘটেছে, যেটাকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। সত্যি বলতে এই প্রবণতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থী দলগুলো থাকলেও সেগুলো বিএনপি বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে অল্প কিছু আসন সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে গেছে কিংবা মাঝে মাঝে কিছু রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানান দিয়েছে। কিন্তু এবারই প্রথম তারা রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পুরোপুরি একটি ইসলামি পরিচয়বাদী রাজনৈতিক দলের জোট এমন একটা তকমা থেকে দূরে থাকার জন্য এনসিপি, এবি পার্টি, এলডিপির মতো কয়েকটি দলকে সঙ্গে রাখলেও তাদের আসনসংখ্যা খুবই নগণ্য। তাই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটটি ইসলামপন্থী পরিচয়বাদী রাজনীতিরই জোট।

জোটের প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক প্রভাব

নির্বাচনে ইসলামপন্থী পরিচয়বাদী জোটটি কতটা ভালো ফলাফল করবে বা আদৌ কোনো সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে পারবে কি না, সেই আলোচনা সরিয়ে রেখেও বলা যায়, দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক জোট হিসেবে স্বাধীনতার পর এই প্রথম তারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর ফ্যাসিবাদবিরোধী আলাপ করতে করতে নতুন ফ্যাসিবাদের উত্থান ঠেকানোর দিকেও মনোযোগী হতে হবে ভোটারদের। ‘অনেককে ক্ষমতায় দেখেছেন, এবার আমাদের দেখুন’ স্লোগানে সাড়া দিয়ে তাদের দেখার মাশুল কী হতে পারে, সেটা খুব কষ্টকল্পনা নয় নিশ্চয়ই। এই জোট যে প্রধান হয়ে উঠতে পারল, তার পেছনে ভূমিকা আছে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিও; আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে থাকলে তাদেরই বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। শেখ হাসিনার পতনের পর আওয়ামী লীগের ওপরেই যৌক্তিক ক্ষোভ ছিল এ দেশের মানুষের। সেটাকে কাজে লাগিয়ে জামায়াত, এনসিপি এবং অন্যান্য ইসলামপন্থী দল আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করাতে না পারলেও তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করানোর মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে পেরেছে।

জামায়াতের ইশতেহার ও বাস্তবতা

এনসিপিসহ জামায়াত জোটের আরও দু-একটি দল তাদের নিজ নিজ ইশতেহার দিলেও ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সেটাকে গুরুত্বহীন মনে করাই উচিত, কারণ জোটটি নির্বাচনে জিতলে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে জামায়াতের চিন্তার ভিত্তিতেই। জামায়াতের ইশতেহার দেখলে দেখা যায়, এটি অন্য একটি মধ্য ডান রাজনৈতিক দলের ইশতেহারের মতোই। যে দলটির নামের সঙ্গে ‘ইসলামী’ আছে এবং যে দলটির গঠনতন্ত্র পড়লে স্পষ্টভাবে মনে হয় এটা কোনো রাজনৈতিক দল না বরং একটা ধর্মীয় সংগঠনের গঠনতন্ত্র, সেই দলটির ইশতেহারে ইসলাম (বিশেষ করে শরিয়াহ) নিয়ে এমন কোনো কথা নেই। দলটির ইশতেহারে মুসলমানদের জন্য ইসলামি শরিয়াহর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ স্বতন্ত্র মুসলিম পার্সোনাল ল প্রণয়নের উদ্যোগের কথা আছে (যেটা বাস্তবে এখনই কার্যকর আছে ভিন্ন নামে), আছে কৃষকদের জন্য শরিয়াহভিত্তিক কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা। এর বাইরে আর এমন কিছু নেই, যাতে দলটি একটি ইসলামি ভাবাদর্শের দল সেটা বোঝা যায়। সম্প্রতি একটি খুতবায় বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিবও এ ব্যাপারটি উল্লেখ করেছেন।

দ্বিচারিতা ও ভবিষ্যৎ হুমকি

আপাতদৃষ্টে এটিকে একটা ভালো প্রবণতা হিসেবে প্রশংসা করাই যেত, কিন্তু বাস্তবতা অতটা সরল নয়। দলটির মধ্যে মারাত্মক রক্ষণশীল মনোভাব আছে, নারীদের জামায়াতের আমির হওয়া নিয়ে স্বয়ং আমিরের বক্তব্য আছে এবং তাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী একজন অমুসলিমের আমির হওয়া দূরে থাকুক, সদস্য (রুকন) হওয়া সম্ভব নয়। এর বাইরেও দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা (এমপি প্রার্থীসহ) ক্ষমতায় গেলে ইসলামি শরিয়াহ কায়েম করার কথা জানিয়েছেন। এমনকি এমন সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেননি স্বয়ং জামায়াত আমির। বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে এ ধরনের প্রশ্ন এলে তিনি বলছেন, জনগণ যদি চায়, তাহলে হবে। মজার ব্যাপার, জনগণ চায় কি না, সেটা প্রমাণের জন্য তাঁরা ইশতেহারের এক নম্বর পয়েন্ট এটা করতে পারতেন, কিন্তু করেননি। দলটির এই ধরনের দ্বিচারিতা কেন, সেটা আগের একটি কলামে লিখেছিলাম। সম্প্রতি বিবিসি নিউজ ইন্ডিয়ার একটি রিপোর্টে দেখা যায়, জামায়াতের ঘাঁটি সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম ৯০ শতাংশ মুসলিমের দেশকে ‘ইসলামিক কানুনের’ ভিত্তিতে চালানোর কথা বলছেন। সে ক্ষেত্রে নারীদের হিজাব করা এবং মাহরাম (বিবাহ সম্পর্ক হারাম এমন পুরুষ) ছাড়া বাইরে না যাওয়ার কথা আলোচনায় এনেছেন।

গণতন্ত্রের জন্য সতর্কবার্তা

সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স বা পারিপার্শ্বিক প্রমাণাদির ভিত্তিতে বলাই যায়, দলটির ভেতরে, সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত এই ধরনের মানসিকতা আছে। এই জোট যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে এই দেশ যে আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে মোরাল পুলিশিংয়ের কবলে পড়বে, তা অনেকটাই নিশ্চিত করে বলা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে ধর্মীয় কট্টরপন্থা (এবং ক্ষেত্রবিশেষে উগ্রবাদও) যেভাবে ক্রিয়াশীল হয়েছে, জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে সেটা এর চেয়ে অনেক বেশি হবে, এটা খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়। আমরা স্মরণ রাখব এই জোটে প্রকাশিত বক্তব্যের বিবেচনায় জামায়াতের চেয়ে আরও অনেক বেশি কট্টর রাজনৈতিক দলও আছে। ভালো নির্বাচন হলেই উদার গণতন্ত্র আসবে এবং সেটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে, এটা আসলে অর্থসত্য। পৃথিবী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ে যেমন প্রত্যক্ষ করেছে, এখন আবার করছে—পরিচয়বাদী (ধর্ম, বর্ণ, ভাষাগত ইত্যাদি) পপুলিস্ট রাজনীতিকে ভিত্তি করেই পৃথিবীতে গণতন্ত্রের ক্রমাগত ক্ষয় (ডেমোক্রেটিক ব্যাকস্লাইডিং) হচ্ছে। হাউ ডেমোক্রেসিজ ডাই কিংবা হাউ টু সেভ এ কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেসি শিরোনামের আলোচিত বইগুলো এই প্রবণতা দেখিয়েছে, কারণ খুঁজেছে এবং সমাধানের আলাপ করেছে।

ভোটারদের দায়িত্ব ও সচেতনতা

বৈশ্বিক এই প্রবণতার আদর্শ উদাহরণ ঠিক আমাদের ঘরের পাশে যেমন আছে, এমন উদাহরণ ছড়িয়ে পড়ছে আমেরিকা, ইউরোপেও। আমাদের ভোটাররা যখন ভোট দিতে যাচ্ছেন, তখন তাঁদের এই প্রবণতা স্মরণ রাখা উচিত হবে। ভোটারদের স্মরণ রাখতে হবে গণতন্ত্র মানেই উদার নয়, এটা এখন দেশে দেশে নির্বাচনের মাধ্যমেই ‘ইললিবারেল ডেমোক্রেসি’ বা অনুদার গণতন্ত্র (যা আদতে ফ্যাসিবাদ)। ভোটাররা নিশ্চয়ই বুঝবেন, কোনো দলের নেতা-কর্মীদের কোনো আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে কিংবা স্থানীয়ভাবে কোনো প্রার্থীকে পছন্দ করার কারণে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে ডানপন্থী পরিচয়বাদী রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনা কিংবা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসনে জিতিয়ে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দেওয়া অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রকে ভয়ংকর বিপদের মুখোমুখি করে তুলবে। শেখ হাসিনার পতনের পর ফ্যাসিবাদবিরোধী আলাপ করতে করতে নতুন ফ্যাসিবাদের উত্থান ঠেকানোর দিকেও মনোযোগী হতে হবে ভোটারদের। ‘অনেককে ক্ষমতায় দেখেছেন, এবার আমাদের দেখুন’ স্লোগানে সাড়া দিয়ে তাদের দেখার মাশুল কী হতে পারে, সেটা খুব কষ্টকল্পনা নয় নিশ্চয়ই।

জাহেদ উর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মতামত লেখকের নিজস্ব