নির্বাচনের আগের দিন ছয় জেলায় বড় অঙ্কের টাকা উদ্ধার, আটক ও দণ্ডের ঘটনা
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগের দিন বুধবার দেশের ছয়টি জেলায় জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা উদ্ধার, আটক এবং একাধিক ক্ষেত্রে দণ্ড দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নীলফামারী, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, জামালপুর, শরীয়তপুর ও সিরাজগঞ্জে এসব ঘটনা ঘটে, যা নির্বাচনী পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নীলফামারীতে ৭৪ লাখ টাকাসহ জামায়াত নেতা আটক
নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে বেলা ১১টার দিকে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধানকে আটক করা হয়। তার সঙ্গে জেলা জামায়াতের দপ্তর সম্পাদক আবদুল মান্নান ছিলেন, তবে তাকে আটক করা হয়নি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এখানে ৫০-৬০ লাখ, ৫০ লাখ প্লাস টাকা আছে।’ কিসের টাকা জানতে চাইলে তিনি ব্যবসায়িক অর্থ বলে দাবি করেন। জিজ্ঞাসাবাদের সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে এবং পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত পৌনে ১টা পর্যন্ত তিনি পুলিশি পাহারায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। নীলফামারীর পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনী পরিবেশে এত বড় অঙ্কের অর্থ বহনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দাবি করেন, ব্যাংক বন্ধ থাকায় ব্যবসায়িক প্রয়োজনে টাকা বহন করা হয়েছিল এবং এতে আইনের ব্যত্যয় হয়নি।
কলাপাড়ায় ৫০ লাখ টাকাসহ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আটক
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক রেজাউল করিম ওরফে কাজল মৃধাকে ৫০ লাখ টাকাসহ আটক করে কোস্টগার্ড। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পৌর শহরের খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রসংলগ্ন এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। কলাপাড়া থানার ওসি মো. রবিউল ইসলাম জানান, রাত ১২টা পর্যন্ত তিনি কোস্টগার্ডের হেফাজতে ছিলেন। পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুসা তাওহীদ নান্নু মুন্সী বলেন, কাজল মৃধা বালু ব্যবসায়ী; এ ঘটনার সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।
লক্ষ্মীপুরে ১৫ লাখ টাকা উদ্ধার
লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত একটি গাড়ি থেকে ১৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। শহরের ঝুমুর এলাকায় তল্লাশিচৌকিতে রাত আটটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় তার ব্যক্তিগত সহকারী বদরুল ইসলাম শ্যামলসহ তিনজনকে আটক করা হলেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটি এ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বলে জেলা জজ আদালতের বিচারক তাহরিনা আক্তার নওরিন নিশ্চিত করেন। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাছিবুর রহমান বলেন, নির্বাচনী ব্যয়ের অংশ হিসেবে ওই অর্থ বহন করা হচ্ছিল। ভিডিও বার্তায় শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, কেন্দ্রভিত্তিক ব্যয়ের জন্য টাকা নেওয়া হচ্ছিল।
মুরাদনগরে ২ লাখ টাকাসহ জামায়াত নেতা আটক
কুমিল্লার মুরাদনগরে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণের অভিযোগে হাবিবুর রহমান হেলালী নামে এক জামায়াত নেতাকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে ২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। হাবিবুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এজেন্টদের খাবারের খরচের টাকা ছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে ফাঁসানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান জানান, হাতেনাতে আটক না হওয়ায় বিষয়টি বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয়েছে।
জামালপুরে তিনজনের জেল ও জরিমানা
জামালপুরের মাদারগঞ্জে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণের অভিযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থীর তিন কর্মীকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হয়। তাদের প্রত্যেককে এক মাসের কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
শরীয়তপুরে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা উদ্ধার, ২ বছরের কারাদণ্ড
শরীয়তপুরের নড়িয়া পৌরসভার একটি নির্বাচনী কার্যালয় থেকে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে গোলাম মোস্তফা নামের এক শিক্ষককে আটক করা হয়। তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট সুজন মিয়া। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকি দাস বলেন, উদ্ধার হওয়া অর্থের বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জামায়াতের স্থানীয় নেতারা অভিযানের সমালোচনা করেছেন।
সিরাজগঞ্জে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
সিরাজগঞ্জ-২ আসনের কামারখন্দ উপজেলায় কেন্দ্রীয় খরচের টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে কয়েকজনকে নামিয়ে তাদের কাছ থেকে ৭১ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বিএনপি নেতা-কর্মীরা টাকা ছিনিয়ে নিয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, ভোট কেনার জন্য টাকা নিয়ে বের হয়েছিল জামায়াত। সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লা আল মামুন বলেন, উভয় পক্ষের বক্তব্যে অসঙ্গতি থাকায় বিষয়টি তদন্তের জন্য বিচারিক কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
নির্বাচনের আগের দিন বিভিন্ন জেলায় বড় অঙ্কের টাকা উদ্ধার ও আটক–দণ্ডের এসব ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
