ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আজ: গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে প্রথম ধাপ
আজ বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। দেশের মানুষ একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভোট দিচ্ছেন, পাশাপাশি সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে 'হ্যাঁ-না' ভোট দিয়ে মত জানাবেন।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি ম্যান্ডেট—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এবারের নির্বাচন গতানুগতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো নয়; এটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম ধাপ হতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত সর্বশেষ তিনটি জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) বিতর্কিত হিসেবে পরিচিতি পায়। সর্বশেষ তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে দুজন এখন কারাগারে। ভোটারদের একটি বড় অংশ বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে পারেনি, ফলে এবার ভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
নির্বাচনী পরিবেশ ও প্রস্তুতি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনের প্রত্যাশা জানিয়েছেন। ভোট গ্রহণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর সাড়ে ৯ লাখের বেশি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে ভোটের প্রচার শান্তিপূর্ণ ছিল বলে জানা গেছে।
ভোট দেওয়ার জন্য দুই দিন ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে বাস, লঞ্চ, ট্রেনে গ্রামের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ
ইসিতে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি দল অংশ নিচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে ইসি, ফলে দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
১৯৯১ সাল থেকে সব কটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবার ভোটে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটের মধ্যে। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো কোনো জাতীয় নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
ভোটার পরিসংখ্যান ও গুরুত্ব
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটার আছেন ৫ কোটির বেশি। অন্যদিকে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী। ফলাফল নির্ধারণে তরুণ ও নারী ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
গণভোট ও সংবিধান সংস্কার
গণভোটে সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা। সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে সরকারি দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার আওতা বাড়বে, যা রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ কোথাও মসৃণ নয়, এটি স্বল্প মেয়াদেও অর্জিত হয় না। বহু মানুষের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে এবার বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এসেছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও প্রশ্ন
নিবন্ধন স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। দেশে-বিদেশে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী মানুষকে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহ্বান জানাচ্ছেন। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, দেড় দশক ধরে দেশ গণতান্ত্রিক ঘাটতির মধ্যে ছিল, এখন যাঁরা ত্রিশের কোঠায়, তাঁরা কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িতরা এখন আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি, তাই কিছু সত্তা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না, তবে এতে ভোটার উপস্থিতি কমবে না।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও প্রত্যাশা
২০২৪ সালের নভেম্বরে এ এম এম নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বে বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেয়। আজ একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠান এই কমিশনের প্রথম পরীক্ষা। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম ধাপ হলো একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ ইতিবাচক, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা যদি দায়িত্বশীল আচরণ করেন, তাহলে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে প্রথম ধাপ পাড়ি দেওয়া সম্ভব হবে।
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেন, 'অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইনকানুনের মধ্যেই কমিটমেন্ট অনুযায়ী কাজ করছি। তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই।' আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে, তার অনেকটা নির্ভর করছে আজকের নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হচ্ছে, তার ওপর।
