ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ঢাকা মহানগরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তাচৌকি বসিয়ে তল্লাশি পরিচালনা করছেন, যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হতে পারে।
ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন
ঢাকা মহানগরের ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় পুলিশ, র্যাব ও আনসারের প্রায় ৫৫ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। ভোট চলাকালে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীতে ৫৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করবে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে একজন পুলিশ সদস্যের শরীরে ‘বডি-ওর্ন ক্যামেরা’ থাকবে, যা সরাসরি ভিডিও চিত্র ধারণ করে নির্বাচনী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে সহায়তা করবে।
নিরাপত্তা বাহিনীর বিশদ পরিকল্পনা
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপিতে বর্তমানে ৩১ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য কর্মরত আছেন, যাদের মধ্যে ২৬ হাজার ৫১৫ জন নির্বাচনী দায়িত্বে থাকবেন। এ ছাড়া ২৭ হাজার ৭০৩ জন আনসার এবং ৫ শতাধিক র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হবে। তাঁদের সঙ্গে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা যুক্ত হবেন।
ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে ঢাকা মহানগরের চারটি স্থানে ‘কন্ট্রোল রুম’ বা নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করা হয়েছে: রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, মিরপুর পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট কার্যালয়, ডিএমপির গুলশান কূটনৈতিক বিভাগের কার্যালয় ও উত্তরা। এ ছাড়া ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগে আটটি ‘সাব-কন্ট্রোল রুম’ থাকবে।
ভোটকেন্দ্রের শ্রেণীবিভাগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ডিএমপি জানায়, মহানগরের ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ‘সাধারণ’—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১ হাজার ৮২৮টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ এবং ৩০৩টি কেন্দ্রকে সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় চারজন পুলিশ সদস্য এবং সাধারণ কেন্দ্রে তিনজন করে থাকবেন। তবে একটি ভেন্যুতে একাধিক কেন্দ্র থাকলে সেখানে পাঁচজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন, এবং প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকবে।
পুলিশের পাশাপাশি প্রতিটি কেন্দ্রে ১০ জন আনসার সদস্য ও ১ জন সহকারী সেকশন কমান্ডার অস্ত্রসহ দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া প্রিসাইডিং কর্মকর্তার নিরাপত্তায় একজন সশস্ত্র আনসার সদস্য থাকবেন। বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে কেন্দ্রে কোনো গোলযোগ বা সহিংসতা হলে পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও সংশ্লিষ্ট থানা থেকে কর্মকর্তারা তা সরাসরি দেখতে পাবেন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইনী পদক্ষেপ
ডিএমপি সূত্র জানায়, নির্বাচনে রাজধানীতে ৫৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে, যেখানে নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং ডিএমপিতে কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেটরা থাকবেন। পুরো বিষয়টি সমন্বয় করবেন ডিএমপির আইন কর্মকর্তা (জেলা জজ পদমর্যাদার) মোহাম্মদ আতাউল হক। তিনি বলেন, নির্বাচন বুথে আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। রাস্তাঘাটে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা বা অন্যান্য নিয়মিত মামলা হলে ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ব্যবস্থা নেবেন।
র্যাবের ভূমিকা ও নির্বাচনী টহল
র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, রাজধানীতে র্যাব সদস্যরা নির্বাচনী টহলে থাকবেন। কোথাও কোনো গোলযোগ বা সহিংসতা হলে নির্বাচন কমিশনের অ্যাপসে যুক্ত থাকা র্যাব সদস্যরা তা জেনে যাবেন এবং সেখানে পৌঁছে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবেন।
ঢাকার নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব
ডিএমপির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা মহানগরের ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঢাকায় বিদেশি পর্যবেক্ষক ও দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি বেশি থাকে, এবং নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে কি না, সেটাও অনেকটা ঢাকার নির্বাচন দিয়েই মূল্যায়ন করা হয়। এ কারণে ঢাকার ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোতায়েন
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্র অনুযায়ী, নির্বাচন উপলক্ষে ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত দিন দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকবে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও কোস্টগার্ড মোতায়েনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের ভোটের ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনী সামগ্রী কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় ২৭ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়ে জোরদার নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজিয়েছে ডিএমপি।
