খুলনায় নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ: সন্ত্রাসী গ্রুপের দাপটে ভোটারদের শঙ্কা
খুলনা অঞ্চলে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও অপরাধীদের গ্রেফতার না হওয়ায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের দিনের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ বিরাজ করছে। স্থানীয় ভোটার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সচেতন ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেছে, এই অঞ্চলে অন্তত সাতটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয়ভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, যার ফলে প্রায় প্রতিদিনই অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে এবং খুনের মতো গুরুতর অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে।
সন্ত্রাসী গ্রুপের সক্রিয়তা ও নির্বাচনী প্রভাব
নির্বাচনের আগে থেকেই শীর্ষ সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হয়েছিল, কিন্তু বেশিরভাগ অপরাধী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে এই অবস্থার তীব্র নিন্দা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের মতে, ভোটারদের নিরাপত্তা দিতে না পারলে ভয়হীন পরিবেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়।
গত বছরের ৩০ নভেম্বর খুলনায় আদালতের সামনের সড়কে সন্ত্রাসী হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুদিন আগে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিল চরমপন্থি দলের দুই নেতা নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম এবং আরমান ওরফে আরমান শেখ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খুলনা মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মহানগরীতে রোহান ও পলাশ গ্রুপ থেকে উদ্ভূত তিনটি বাহিনী—পলাশ, গ্রেনেড বাবু এবং নুর আজিম—সক্রিয় রয়েছে। এছাড়াও দৌলতপুরের শীর্ষ চরমপন্থি হুমায়ুন কবির হুমা, আরমান শেখ ও নাসিমুল গণির আলাদা বাহিনী কাজ করছে। নাসিমুল গণি শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলায় দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও গত বছরের ২৮ নভেম্বর উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে মুক্তি লাভ করে।
এই কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেছেন যে ডুমুরিয়া, ফুলতলা, দৌলতপুর, তালাসহ বেশ কিছু এলাকায় চরমপন্থিদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, মোংলা, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা এলাকায় বনদস্যুদের দাপট এখনও রোধ করা যায়নি। কিছু নামমাত্র সন্ত্রাসী অস্ত্রসহ গ্রেফতার হলেও শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীরা এখনও আইনের হাত থেকে মুক্ত রয়েছে।
রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া
খুলনা-২ আসনের প্রার্থী ও খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ। গত এক বছরে ৫৮টি খুন ও ৫০টির ওপরে লাশ নদীতে পাওয়া গেছে। এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম ও গোয়েন্দা নজরদারি দৃশ্যমান মনে হয়নি।"
খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে ১১ দলীয় জোট প্রার্থী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচনি এলাকায় অবৈধ অস্ত্রধারীদের আনাগোনা এবং চরমপন্থিদের অপতৎপরতার আশঙ্কার কথা পুলিশ সুপারকে জানিয়েছেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, "নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের হুমকি, কালো টাকা বিতরণ এবং সাইবার হামলার চেষ্টা করা হচ্ছে।"
প্রশাসনের দাবি ও বাস্তবতা
খুলনার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আ. স. ম. জামশেদ খোন্দকার দাবি করেছেন যে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের থেকে উন্নত হয়েছে। তিনি বলেন, "ইতোমধ্যে পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছি। নির্বাচনে সব কেন্দ্রকেই আমরা অধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।"
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারে ডিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, "নির্বাচন তার গতিতে চলবে। এর সঙ্গে সন্ত্রাসী এবং অস্ত্রের ব্যবহারের কোনও সম্পর্ক নেই। তবে নির্বাচনে যদি কেউ অস্ত্রের ব্যবহার করে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।"
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের প্রচেষ্টা
খুলনা র্যাব-৬-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নিস্তার আহমেদ বলেছেন, নির্বাচনের আগে অনেক অস্ত্র, ককটেল ও বোমা উদ্ধার করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিভাগের আট জেলায় ৬৮টি টহল টিম পরিচালনা করছে র্যাব।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক জানিয়েছেন, ১৮ জানুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৮ দিনব্যাপী উপকূলীয় এবং নদী তীরবর্তী এলাকার ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবে কোস্টগার্ড। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন নজরদারি ও নিয়মিত টহলের মাধ্যমে উৎসবমুখর ভোটের পরিবেশ সৃষ্টির প্রচেষ্টা চলছে।
তবে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব আইনজীবী বাবুল হাওলাদারের মতে, "নির্বাচনের একদিন বাকি থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, অবৈধ অস্ত্রধারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।" এই অবস্থায় ভোটের দিনের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ ও আশঙ্কা কাটিয়ে ওঠা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
