বাংলাদেশে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আজ বৃহস্পতিবার
বাংলাদেশে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশব্যাপী গণভোটের পাশাপাশি এই নির্বাচনটি পরিচালিত হচ্ছে উচ্চ নিরাপত্তা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং ভোটার অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। ভোটগ্রহণ চলবে সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত।
ভোটকেন্দ্র ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
দেশের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত করা হয়েছে। মোট ৪২,৬৫৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলবে এবং ডাক ভোট গণনার জন্য অতিরিক্ত ২৯৯টি কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন প্রায় অর্ধেক ভোটকেন্দ্রকে 'গুরুত্বপূর্ণ' বা 'উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে।
নির্বাচনী নিরাপত্তায় প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং সহায়ক বাহিনীর সদস্যরা এই দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের সহায়তায় রয়েছেন ২,১০০টি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬৫৭টি বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট যারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে সক্ষম।
প্রযুক্তির ব্যবহার ও পর্যবেক্ষণ
প্রথমবারের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন প্রায় ২৫,০০০ বডি-ওয়্যার্ন ক্যামেরা এবং নির্বাচিত এলাকায় ড্রোন ব্যবহারের কথা নিশ্চিত করেছে। ৯০% এর বেশি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, "এই ব্যবস্থাগুলো ভীতি প্রদর্শন রোধ, জবাবদিহিতা শক্তিশালীকরণ এবং ভোটারের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য নেওয়া হয়েছে।"
৪৫,৩৩০ জন দেশীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং প্রায় ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষককে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৯,৭০০ জন সাংবাদিক নির্বাচন কভারেজের জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি সংবাদদাতা রয়েছেন।
ভোটার ও প্রার্থীর তথ্য
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ১২ হাজার ৩৮৪ জন নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে ৬ কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার ৩৮২ জন পুরুষ, ৬ কোটি ২৮ লাখ ৫০ হাজার ৭৭২ জন নারী এবং ১,২৩০ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
৫০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ২,০২৮ জন প্রার্থী ২৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মাত্র ৮১ জন প্রার্থী নারী, যা রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ধীর গতি নির্দেশ করে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো মন্তব্য করেছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই নির্বাচনটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পূর্ববর্তী নির্বাচনের মতো কোনো প্রভাবশালী বহুদলীয় জোট দেশব্যাপী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ করলেও অনেক আসনে বিএনপি-সম্পর্কিত প্রার্থীরা স্বতন্ত্র বা স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জাতীয় নাগরিক দল শহুরে যুবকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দুর্নীতিবিরোধী ও নৈতিক শাসনের প্ল্যাটফর্মে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
ভোটারের প্রতিক্রিয়া
ভোটারদের মধ্যে মিশ্র অনুভূতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঢাকার প্রথমবারের ভোটার নাফিস ইসলাম বলেন, "আমি অন্তত একবার ভোট দিতে চাই, কী হবে তা নিয়ে চিন্তা না করে।"
গাজীপুরের একজন গার্মেন্টস কর্মী রিনা বেগুম বলেন, "নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাকে নিরাপদে ভোট দিয়ে কাজে ফিরতে সক্ষম হতে হবে।"
কুমিল্লার ৭২ বছর বয়সী আব্দুল মতিন বলেন, "আমি অনেক নির্বাচন দেখেছি। ক্যামেরা সাহায্য করে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের আচরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"
চূড়ান্ত প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ মঙ্গলবার ঢাকায় চূড়ান্ত প্রাক-নির্বাচন ব্রিফিংয়ে বলেন, নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল নির্বাচন পরিচালনার জন্য "সম্পূর্ণ প্রস্তুত" রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, "আমাদের ফোকাস হলো ভোটাররা যেন বাধা বা ভয় ছাড়াই ভোট দিতে পারে। কোনো অনিয়ম হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার মোকাবিলা করা হবে।"
ভোটার উপস্থিতি সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হিসেবে রয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন পূর্ববর্তী নির্বাচনের তুলনায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধির আশা করলেও বিশ্লেষকরা রাজনৈতিক মেরুকরণ, ভোটার ক্লান্তি এবং অবশিষ্ট অবিশ্বাসের কথা উল্লেখ করে বিভক্ত মতামত দিয়েছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচনের তুলনায় বাংলাদেশের এই নির্বাচন বিশাল নিরাপত্তা মোতায়েন এবং প্রযুক্তিগত নজরদারির জন্য আলাদা, তবে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলকতা নিয়ে প্রশ্নও থেকেই যাচ্ছে।
