প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গণভোটের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছেন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় দেওয়া এই ভাষণে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানান।
গণতন্ত্রের অপরিহার্য সত্য
ড. ইউনূস বলেন, বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করার জন্য তিনি সকলের প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি উল্লেখ করেন, আর মাত্র একদিন পরই সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট, যা সারা জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার দিন।
শান্তিপূর্ণ প্রচার-প্রচারণা ও সহিংসতার বেদনা
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সার্বিক প্রচার-প্রচারণা পূর্ববর্তী যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে। মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো সংযম দেখিয়েছে, প্রার্থীরা দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন এবং সাধারণ মানুষ সচেতন থেকেছেন। তবে তিনি এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মাঝেও গভীর বেদনার কথা উল্লেখ করেন, কারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এবং প্রচার-প্রচারণাকালে সংঘটিত কয়েকটি সহিংস ঘটনায় কিছু মূল্যবান প্রাণ হারানো হয়েছে।
ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে নির্বাচন
ড. ইউনূস বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়, বরং এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ দেখা গেছে, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। তিনি বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না, একইসঙ্গে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে।
তরুণ ও নারী ভোটারদের প্রতি বিশেষ আহ্বান
প্রধান উপদেষ্টা বিশেষভাবে তরুণ ভোটার ও নারী ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, গত ১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে না পারা এই প্রজন্মের জন্য এই ভোট তাদের প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ। তিনি বলেন, আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না, এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে। নারীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীরাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা এবং এ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
নির্বাচনী নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির ব্যবহার
নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানান ড. ইউনূস। এবার রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও ব্যাপকভাবে দায়িত্বে রাখা হয়েছে। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো সারাদেশে ব্যাপক পরিসরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা শরীরে ক্যামেরা ব্যবহার করছেন, এবং নিরাপত্তা ও নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রবাসী ভোটার ও বিশেষ সুবিধা
প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা গণতন্ত্রের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। একইসঙ্গে দেশে অবস্থানরত সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং আইনি হেফাজতে বা কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি নির্দেশ
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্দেশ দেওয়া উচিত, যেন কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল, ভোটে প্রভাব বিস্তার করা কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়। তিনি সতর্ক করেন, রাষ্ট্র কোনোভাবেই এ ধরনের আচরণ সহ্য করবে না।
গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সতর্কতা
ড. ইউনূস বলেন, নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে নাগরিকদের মনে সন্দেহ, ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তিনি জনগণকে সতর্ক থাকতে এবং যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার না করার অনুরোধ জানান। নির্বাচনবন্ধু হটলাইন— ৩৩৩ এতে ফোন করে সঠিক খবর জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
জুলাই সনদের গুরুত্ব ও গণভোটের তাৎপর্য
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জুলাই সনদ কোনো দলের একক ইশতেহার নয়, বরং দীর্ঘ নয় মাস ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এটি প্রস্তুত করেছে। এই সনদ জাতির ভবিষ্যৎ পথচলার এক ঐতিহাসিক দলিল এবং গণঅভ্যুত্থানের চেতনার প্রতিফলন। তিনি বলেন, এই গণভোটে আপনার একটি ভোট শুধু একটি কাগজে দেওয়া সিল নয়, এটি আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ, আপনার পরিবারের নিরাপত্তা এবং দেশের আগামী দিনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হস্তান্তর
ড. ইউনূস বলেন, নির্বাচন হয়ে গেলে নির্বাচিত সরকার দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং তার সঙ্গে শেষ হবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব। তিনি বলেন, আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এবং গৌরবের সঙ্গে নবনির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে, তাদের সাফল্য কামনা করে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ কাজে ফিরে যাবো। তিনি এই শুভ মুহূর্তের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন বলে জানান।
