পাবনার ঈশ্বরদীতে মক্কেল মৃধার বিরুদ্ধে ৩২ অভিযোগ, ভোটারদের রগ কাটার হুমকিতে আতঙ্ক
পাবনায় মক্কেল মৃধার বিরুদ্ধে ৩২ অভিযোগ, ভোটারদের হুমকিতে আতঙ্ক

পাবনার ঈশ্বরদীতে মক্কেল মৃধার বিরুদ্ধে ৩২ অভিযোগ, ভোটারদের রগ কাটার হুমকিতে আতঙ্ক

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চল এখন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় কৃষক দলের আহ্বায়ক মক্কেল মৃধা ওরফে মক্কেল কসাইয়ের বিরুদ্ধে থানায় ৩২টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এই অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ভোটারদের রগ কেটে দেওয়ার প্রকাশ্যে হুমকি, জামায়াত প্রার্থীর ওপর হামলা এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে জমি দখল, চাঁদাবাজি, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অপরাধের বিবরণ।

অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ, কিন্তু পদক্ষেপ নেই

এত অভিযোগ জমা পড়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। এজন্য সাধারণ মানুষ ও ভোটাররা এখন নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগে আছেন। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, অপরাধের তালিকা দীর্ঘ হলেও অভিযুক্ত মক্কেল মৃধা বিএনপির রাজনীতি করায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। তিনি এলাকার মানুষজনকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন, যা নির্বাচনি পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

মক্কেল মৃধার পরিচয় ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা

মক্কেল মৃধা সাহাপুর ইউনিয়নের চর গড়গড়ী গ্রামের মৃত মানিক মৃধার ছেলে। পেশায় কসাই ও মাংস ব্যবসায়ী। স্থানীয়দের ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি নিজেকে চরাঞ্চলের প্রভাবশালী বিএনপি নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। পরে কৃষক দলের আহ্বায়ক পদ পেয়ে এবং স্থানীয় বিএনপি নেতা ও পাবনা-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবের সমর্থন নিয়ে এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

ভুক্তভোগীদের বর্ণনা ও আতঙ্ক

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চর গড়গড়ী গ্রামের পাঁচ জন বাসিন্দা জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ বাসিন্দাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, ফসল লুট, গবাদিপশু লুট, শতাধিক বাড়িতে চাঁদাবাজি এবং কয়েকশ বিঘা জমি দখল করেছেন মক্কেল মৃধা। ভুক্তভোগীদের একটি অংশ আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। এত বড় অপরাধের পরও পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। এ অবস্থায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে সন্দেহ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা

সম্প্রতি আওতাপাড়া এলাকায় গরুর হাট দখলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের একাংশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পরে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবের মধ্যস্থতায় বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই মধ্যস্থতার পর মক্কেল মৃধার দাপট আরও বেড়ে যায়।

জামায়াত প্রার্থীর ওপর হামলা

গত ২৭ নভেম্বর চর গড়গড়ী গ্রামে জামায়াতের প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডলের ওপর হামলার ঘটনায় মক্কেল মৃধাকে প্রধান আসামি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর তিনি কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন। পরে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবের মদতে এলাকায় আসেন।

রগ কাটার হুমকি ও ভোটারদের ভয়

গত ১ ফেব্রুয়ারি এই আসনের জামায়াত প্রার্থীকে ভোট দিলে ভোটারদের রগ কাটার হুমকি দেন মক্কেল মৃধা। ওই দিন সাহাপুর ইউনিয়নের চর গড়গড়ী দাখিল মাদ্রাসার মাঠে পাবনা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবের নির্বাচনি জনসভায় এ হুমকি দেন। এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর চরাঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, এখন সাধারণ ভোটাররাও কেন্দ্রে যেতে ভয় পাচ্ছেন।

পুলিশের অভিযান ও তথ্য ফাঁসের অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৫ ফেব্রুয়ারি যৌথ বাহিনী তার বাড়িতে অভিযান চালায়। সে খবর আগেই পেয়ে পালিয়ে যান মৃধা। ফলে এলাকাবাসীর মধ্যে ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে তিনি প্রশাসনের আগাম তথ্য পাচ্ছেন। ভোটারদের শঙ্কা, দ্রুত তাকে গ্রেফতার না করা হলে নির্বাচনি পরিবেশ ভয়াবহভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।

থানায় অভিযোগের বিস্তারিত তালিকা

ভুক্তভোগী একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকায় সহিংসতা ও দখলদারিত্ব চালিয়েছেন মক্কেল মৃধা। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে:

  • আক্তার মণ্ডলের তিনটি গরু লুট
  • বাদশা সরদারের ৭০ বিঘা জমি দখল
  • মতি সরদারের বাড়ি থেকে ১৪ ভরি স্বর্ণ, চারটি গরু, ছয়টি ছাগল, দুটি মোটরসাইকেল ও সাত লাখ টাকা লুট
  • আনোয়ারুল খাঁর বাড়ি থেকে তিনটি গরু ও ১০-১২ লাখ টাকার মালামাল লুট
  • সোনা প্রামাণিকের বাড়ি থেকে ১৮টি গরু ও ২২টি ছাগল লুট
  • রইজুল সরদারের ৩০০ ব্যাগ সিমেন্ট, ১২২ মণ রড ও ৩০ হাজার ইট লুট
  • পল্লী চিকিৎসক শরিফুল ইসলামের ১০ বিঘা জমি দখল ও ৯ লাখ টাকা চাঁদা আদায়
  • ফরজ সরদার ও সাত্তার সরদারের ২০ বিঘা করে জমি দখল
  • ফজলুল সরদারের ২২ বিঘা কলাবাগান লুট
  • পল্লী চিকিৎসক ইকবালের বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ
  • আলহাজ মোড়ে রমজান প্রামাণিকের দোকান থেকে ২০ লাখ টাকার মালামাল লুট
  • সুমন মালিথার ফার্মেসি থেকে ২ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ

এসব বিষয়ে জানতে মক্কেল মৃধার মোবাইল নম্বরে দুদিন একাধিকবার কল দিয়ে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে এলাকায় গিলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশের বক্তব্য: গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে

ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিনুজ্জামান বলেন, ‘ভোটারদের হুমকির ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। আমি এখানে দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন অভিযোগ পাইনি। বাকিগুলো আগের অভিযোগ। সবগুলো তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পাবনার পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘মক্কেল মৃধার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ ও হুমকির বিষয়গুলো সম্পর্কে পুলিশ সুপারের কার্যালয় অবগত আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং নির্বাচন ঘিরে কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা যাতে না ঘটে, সে লক্ষ্যে পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’