পটুয়াখালী-৩ আসনে চার প্রার্থীর তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভূমিকা মুখ্য
পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা-গলাচিপা) আসনে আগামী নির্বাচনে বিএনপি জোটের গণঅধিকার পরিষদ, দলের বিদ্রোহী প্রার্থী, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের মধ্যে ভোটের লড়াই জমে উঠেছে। এখানে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যদিও আওয়ামী লীগ সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না, তবুও এখানে সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে দলটির ভোটাররাই। তাদের সমর্থনই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে এ আসনের চূড়ান্ত ফলাফল।
প্রার্থীদের পরিচয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠ
বিএনপির সমঝোতায় জোটের প্রার্থী হিসেবে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর ট্রাক প্রতীকে নির্বাচন করছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা হাসান মামুন ঘোড়া প্রতীকে। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক মু শাহ আলম দাঁড়িপাল্লা ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি আবু বকর সিদ্দীক হাতপাখা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। শুরু থেকেই এ আসনটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যেখানে নুরুল হক নুর ও হাসান মামুন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন।
আওয়ামী লীগের ভোটারদের গুরুত্ব ও প্রভাব
এ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ভোটারদের একটি বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামীপন্থি। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের ভোটারদের দাম এখন তোলায় তোলায়। সব প্রার্থীই অপর প্রার্থীকে আওয়ামী লীগ বিরোধী হিসেবে চিত্রিত করে নিজেকে ‘কাউকে নির্যাতন করিনি’ বলে তুলে ধরছেন। হাসান মামুন নুরুল হক নুরকে আওয়ামীবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করছেন, যা কিছু আওয়ামী লীগ ভোটারকে ঘোড়ার দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের অবস্থা ও ভোটারদের মতামত
মাঠপর্যায়ে দুই প্রধান প্রার্থী নুর ও মামুন শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। নির্বাচনি লড়াইয়ের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি প্রচারণা ও ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত রয়েছে। গলাচিপা উপজেলার আমখোলা ইউনিয়নের ভোটার ইমরান হোসেন বলেন, ‘এলাকায় নুরের ট্রাকের যে ভোট নাই বিষয়টি এমন না, ট্রাকের ভালো ভোট আছে। দূর থেকে দেখে আপনারা বুঝবেন না।’ অন্যদিকে, হাসান মামুনের ঘোড়ার জন্য স্থানীয় প্রভাবশালীরা কাজ করছেন, যা প্রকাশ্যে তার পক্ষে থাকলেও কিছু সাধারণ ভোটার ট্রাককে সমর্থন দিতে পারেন।
অন্যান্য প্রার্থীদের অবস্থান ও সম্ভাবনা
জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি আবু বকর সিদ্দীক দাবি করেন, ‘গলাচিপা-দশমিনায় জয়ের ব্যবহারে আমরা শতভাগ আশাবাদী। এ আসনে সাংগঠনিকভাবে আমরা শক্ত অবস্থানে আছি।’ জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মু শাহ আলম বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভোটারদের সাড়া পাচ্ছি। জামায়াতে ইসলামীকে মানুষ ভালোবেসে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবেন।’ তাদের ভোট ভাগাভাগির সুযোগ নিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ভোটারদের মনোভাব ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণ
গলাচিপার চৌরাস্তা এলাকার এক কৃষক বলেন, ‘আগে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি নৌকায় দিতাম, এখন তো নৌকা নাই। নুরকেই (ট্রাক) দেবো, নুর ঘাউড়া ছেলে ওর দ্বারা গলাচিপার উন্নয়ন হবে।’ অন্যদিকে, গলাচিপার উলানিয়া খালগোরা এলাকার আলমগীর হোসেন মত দেন, ‘ট্রাক ও ঘোড়া মুখোমুখি অবস্থানে আছে। তাদের দুই জনেরই ভালো ভোট আছে। এ অবস্থায় জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা ও ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা জোটে থাকলে তাদের অবস্থান সবচেয়ে ভালো থাকতো।’
আসনের পরিসংখ্যান ও চূড়ান্ত প্রত্যাশা
পটুয়াখালী-৩ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১২৪টি, ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৪০৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৭৪ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৮৬ হাজার ২২৬ জন। চার প্রার্থীর কমবেশি ভোট থাকায়, প্রার্থীদের মধ্যে বেশি ভোটের ব্যবধান হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ভোটারদের একটি অংশ ভোট দিতে না যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে, যা ফলাফলকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
