বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও মাঠে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনসিসি সদস্যদের নির্বাচনী দায়িত্বে রাখার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
বিএনসিসির প্রস্তাব এবং ইসির জবাব
মঙ্গলবার জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছুউদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ মোট ছয় দফা প্রস্তাব সম্বলিত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছিল বিএনসিসি। কমিশন তাদের এই আবেদনটি নথিভুক্ত করেছে এবং আপাতত আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের মাঠের দায়িত্বে রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে।
পূর্ব অভিজ্ঞতা ও বিএনপির আপত্তি
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনসিসি সদস্যদের ভোটগ্রহণের কার্যক্রমে মোতায়েন করার বিষয়ে রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছিল। তীব্র আপত্তির মুখে তখন ক্যাডেটদের ভূমিকা কেবল পোস্টাল ব্যালট কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরাসরি দায়িত্ব পালন এবং নতুন ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে সহায়তার আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠায় সংস্থাটি। কমিশন এই আবেদনটি গ্রহণ করে নথিপত্র হিসেবে জমা রাখলেও মাঠপর্যায়ে তাদের কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।
বিএনসিসির সক্ষমতা ও প্রস্তাবিত ভূমিকা
নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো আনুষ্ঠানিক চিঠিতে বিএনসিসি তাদের নানা যুক্তি ও সক্ষমতার কথা তুলে ধরে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, দেশের যুবসমাজের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম এবং দায়িত্ববোধ তৈরিতে তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি গত সংসদ নির্বাচনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতে তাদের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে দাবি করে বিএনসিসি। তাদের পাঠানো ছয় দফা প্রস্তাব অনুযায়ী, ক্যাডেটরা ভোটকেন্দ্রে সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান, ভোটারদের জন্য হেল্প ডেস্ক পরিচালনা এবং বয়স্ক, নারী ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের কেন্দ্রে যাতায়াত ও ভোটদানে সহায়তা করতে পারে। এর পাশাপাশি ভোটার তালিকা হালনাগাদের তথ্য সংগ্রহ এবং ডিজিটাল ডেটা এন্ট্রির কাজেও কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে তারা। বিএনসিসির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ক্যাডেটদের মতো তরুণদের সম্পৃক্ত করা হলে তা সামগ্রিকভাবে পুরো প্রক্রিয়ায় যুবসমাজের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করবে এবং সাধারণ জনমনে নির্বাচন নিয়ে আস্থা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
পূর্বের পরিকল্পনা ও বর্তমান অবস্থা
উল্লেখ্য, ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শুরুতে প্রায় ১৬ হাজার বিএনসিসি সদস্যকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগের একটি বিশাল পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তির মুখে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে মাত্র ১ হাজার ৪০০ জন সদস্যকে পোস্টাল ব্যালটের নিরাপত্তায় সীমিত আকারে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে দেশজুড়ে বিএনসিসির মোট সক্রিয় সদস্য সংখ্যা ২১ হাজার।
জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য
সার্বিক বিষয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছুউদ বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনসিসি সদস্যদের নিয়োজিত করার মতো কোনো পরিকল্পনা কমিশনের নেই। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কেবল নির্দিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই নির্বাচনী মাঠে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। যেহেতু বিএনসিসি সেই আইনি সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না, তাই তাদের এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত করা সম্ভব নয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিষয়ে তিনি জানান, বর্তমানে ভোটার তালিকা পুরোপুরি হালনাগাদ অবস্থাতেই রয়েছে, যার কারণে এই কাজেও বিএনসিসির বাড়তি সহায়তার কোনো প্রয়োজন দেখছে না ইসি। সংসদ নির্বাচনে তাদের আগে থেকেই একটি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলেই শেষ মুহূর্তে সীমিত আকারে পোস্টাল ব্যালটের দায়িত্বে রাখা হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।



