পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জ্ঞানেশ কুমারের চ্যালেঞ্জ: তৃণমূল বনাম বিজেপির যুদ্ধে সাসপেন্স তুঙ্গে
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এবার এমন টানটান উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে, যা রাজ্যের ইতিহাসে বিরল। সম্ভাব্য ফলাফল ঘিরে সাসপেন্স, চৈত্র মাসের তাপপ্রবাহের মতো তপ্ত সমাজ এবং দুই প্রধান শিবিরের মধ্যে ঘৃণামিশ্রিত রেষারেষি বঙ্গসমাজ আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। পাঁচ বছর আগের ২০২১ সালের ভোটেও উত্তেজনা ছিল, কিন্তু এবারের তুলনায় তা ছিল নিতান্তই সরল।
জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা: নির্বাচন কমিশনের নতুন চাল
এবারের ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের মূল চ্যালেঞ্জার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার। তাঁর ভূমিকা অদৃষ্টপূর্ব, এবং কোনো রাজ্যের শাসক দলের বিরুদ্ধে এমন সাঁড়াশি আক্রমণ সংসদীয় ভারতের চুয়াত্তর বছরের ইতিহাসে দেখা যায়নি। ছয় মাস ধরে সবচেয়ে চর্চিত, সমালোচিত, বন্দিত এবং নিন্দিত চরিত্র হয়ে উঠেছেন জ্ঞানেশ কুমার, যিনি এবারের ভোটকে হিচককীয় থ্রিলারে রূপান্তরিত করেছেন।
সোমবার কলকাতায় অবতরণের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জানা গেল, জ্ঞানেশ কুমার নতুন চাল চেলেছেন। প্রথম দফার ভোটের তিন দিন ও দ্বিতীয় দফার নয় দিন আগেই রাজ্যের সব মদের দোকান ও পানশালা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন, যা গাইডলাইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভোটের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে হওয়ার কথা। একইভাবে তিন দিন আগেই সব থানার কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে, অলিখিতভাবে, যার অর্থ পুলিশের অনুমতি ছাড়াই কেন্দ্রীয় বাহিনী ব্যবস্থা নেবে। তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করছে, এভাবে অঘোষিতভাবে জারি হয়েছে জরুরি অবস্থা।
ভোটার তালিকা সংশোধন: বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু
জ্ঞানেশ কুমারের চর্চা শুরু হয় গত বছর বিহারের ভোটের কয়েক মাস আগে, যখন তিনি ভোটার তালিকার 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নির্দেশ দেন। তাঁর মতে, শাসকশ্রেণির ভোট জেতার অন্যতম হাতিয়ার ভুয়া ভোটার, এবং সেই আগাছা সাফ করাই এসআইআরের লক্ষ্য। এই যুক্তিতে বিহারে শুরুতে ৬৫ লাখ ভোটারের নাম বাদ যায়, যাঁরা নাকি মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা যাঁদের নাম একাধিক কেন্দ্রে পাওয়া গেছে।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর করতে নেমে টিম জ্ঞানেশ প্রথমে বাদ দেয় ৫৮ লাখ নাম, কিন্তু বিতর্ক শুরু হয় যখন একধাক্কায় আরও ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। তৃণমূল কংগ্রেস জানপ্রাণ দিয়ে ইসিকে চ্যালেঞ্জ জানায়, এবং শুরু হয় বিজেপি-জ্ঞানেশ 'অশুভ আঁতাতের পর্দা ফাঁস' ও ইসির বিরুদ্ধে মামলা। শেষ পর্যন্ত ৯১ লাখ নেমে আসে ৬১ লাখে, এবং 'বিচারাধীন' তালিকা থেকে বেরিয়ে আসেন আরও ৩২ লাখ ভোটার, প্রধানত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৌলতে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা: কঠোরতা ও সমালোচনা
জ্ঞানেশ কুমার এবারের ভোটে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ৮৮ হাজার বুথ মুড়ে দেওয়া হয়েছে দুই লাখ সিসি ক্যামেরায়, এবং ভোটের দিন হবে রিয়েল টাইম ওয়েবকাস্টিং। কলকাতায় খোলা হচ্ছে 'ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল অ্যান্ড কমান্ড সেন্টার', যেখানে ৯০টি স্ক্রিনে ২০০ পর্যবেক্ষক একসঙ্গে ৫০০ বুথে নজরদারি রাখবেন। সব জেলায় খোলা হচ্ছে কন্ট্রোল রুম, এবং বেগরবাই বা গড়বড় হওয়ার আগাম আন্দাজ পেতে সাহায্য করবে কৃত্রিম মেধা বা এআই।
তবে, নাম বাদ যাওয়ার চিন্তা, দুশ্চিন্তা ও কাজের চাপ সহ্য করতে না পারা শতাধিক মানুষের মৃত্যু ও আত্মহত্যার দায় জ্ঞানেশ কুমার নেননি, এবং এমন তাড়াহুড়া ও অব্যবস্থায় কেন এসআইআর, সেই প্রশ্নও সুপ্রিম কোর্ট করেননি। এই অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবারের ভোটকে 'বাঙালি বনাম বহিরাগত' হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে একদিকে বাঙালির মান, মর্যাদা ও আত্মসম্মান রক্ষার প্রশ্ন, অন্যদিকে বহিরাগত ধূর্ত অবাঙালির আগ্রাসন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: তীব্র রেষারেষি
তৃণমূল কংগ্রেসের চোখে জ্ঞানেশ কুমার বিজেপির বিশুদ্ধ এজেন্ট, এবং রেষারেষি এত তীব্র যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, কমিশনের বৈঠকে তাঁকে সম্মান দেখাতে জ্ঞানেশ উঠে পর্যন্ত দাঁড়াননি। তৃণমূল সরকারের প্রতি জ্ঞানেশের অবিশ্বাস এতটাই যে সন্ত্রাসমুক্ত ভোট করাতে রাজ্যের প্রায় ৬০০ পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তাকে বদলি করেছেন। তাঁর সর্বশেষ ছক চার হাজার 'দুষ্টকে' আত্মসমর্পণ করতে বলা এবং ৮০০ জন তৃণমূল নেতা-কর্মীকে আটক করা, যা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।
পশ্চিমবঙ্গের এবারের ভোট তাই এত ক্ষুরধার, এত অনিশ্চিত, এবং সাসপেন্সে মোড়া। শেষ হাসি কে হাসবে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নাকি বিজেপি-ইসির যুগলবন্দী? উত্তর কঠিন, যদিও পরম্পরা হলো, এই ধরনের লড়াইয়ে তৃণমূলেশ্বরী এখনো অজেয়।



