পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব নাকচ, অমিত শাহের কড়া হুঁশিয়ারি
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার প্রচারের শেষ দিনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একটি কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে আম জনতা পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীরের প্রস্তাবিত বাবরি মসজিদ বানানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে, পশ্চিমবঙ্গের কার্শিয়াংয়ের সুকনায় আয়োজিত জনসভায় তিনি এই ঘোষণা দেন। আগামী বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, এই দফার ভোট গ্রহণ করা হবে বলে নির্ধারিত রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে অমিত শাহের তীব্র ভাষণ
প্রচারের শেষ দিনে নির্বাচনী হাওয়া জোরদার করতে অমিত শাহ সকালে কার্শিয়াংয়ের সুকনায় জনসভা করেন। এরপর তিনি বর্ধমানের কুলটি এবং মেদিনীপুরের শালবনীতেও আরও দুটি জনসভা পরিচালনা করেন। এসব জনসভায় তিনি বাংলার তৃণমূল সরকারকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে বলেন, তাদের সময় ফুরিয়ে এসেছে এবং এবার তাদের বিদায় নিতে হবে। তিনি দাবি করেন যে রাজ্যবাসী ইতিমধ্যেই দুর্নীতিবাজ তৃণমূল সরকারকে গদিতে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
অমিত শাহ আরও উল্লেখ করেন যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর দার্জিলিংয়ের গোর্খাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে। যেসব গোর্খার নাম ভোটার তালিকায় ওঠেনি, নির্বাচনের পর তাদের সবার নাম তোলা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন। তৃণমূল সরকার গোর্খাদের সঙ্গে যে অন্যায় ও অবিচার করেছে, তা সংশোধন করে তাদের দাবি মেটানো হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নির্বাচনী হিংসা রোধে কঠোর হুঁশিয়ারি
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ২৩ তারিখে তৃণমূলের কোনো গুন্ডা যেন ঘর থেকে বের না হয় এবং কোনো হাঙ্গামা না করে। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে করলেই তাদের কারাগারে ঢোকানো হবে। ৪ তারিখের পর অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বের করে তাড়িয়ে দেওয়া হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এই বক্তব্য নির্বাচনী সহিংসতা রোধে তার কঠোর অবস্থানকে তুলে ধরে।
প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রচারাভিযান
প্রথম দফার প্রচারের শেষ দিনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলদিয়া, ব্যারাকপুর, জগদ্দল ও জোড়াসাঁকোয় জনসভা করেন। তিনি বিজেপির সমালোচনা করে বলেন, বিজেপি বলছে ঝুট, করছে লুট। তিনি উল্লেখ করেন যে বিজেপি বাংলার জন্য এক পয়সাও দেয় না এবং নারীদের ওপর অন্যায়-অত্যাচার করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও প্রশ্ন তোলেন যে বিজেপির দুই কোটি চাকরি আর ১৫ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কোথায় গেল। তিনি বলেন, আজ বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মাছ, মাংস, ডিম খাওয়া বন্ধ, এবং তারা বাংলায় এসব খাওয়া বন্ধ করে দিলে মানুষ খাবে কী?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটের সময় বিজেপির চমকানো এবং ভোট শেষ হলে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আমাদের কাছে কোনো ভেদাভেদ নেই, আমরা সবাই এক। তিনি একসঙ্গে থাকার এবং বিজেপি-মুক্ত বাংলা গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
প্রচারের শেষ দিনে অন্যান্য নেতারাও বিভিন্ন স্থানে জনসভা ও রোড শোতে অংশ নেন। এর মধ্যে রয়েছে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ভগবানপুরে, বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী তমলুকে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর চিনারপার্কে, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা পাত্র আসানসোলে, কংগ্রেস নেতা শচীন পাইলট বহরমপুরে, আম জনতা পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীর নওদায় এবং ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের আরাবুল ইসলাম দক্ষিণ ২৪ পরগনার জীবনতলায়।
নির্বাচনী নিরাপত্তা ও পর্যটনকেন্দ্রে নিষেধাজ্ঞা
আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে রাজ্য প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র দীঘা, মন্দারমণি, তাজপুর এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট এলাকায় বাইরের মানুষদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ছয়টা থেকে বৃহস্পতিবার প্রথম দফার নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত এই নির্দেশ কার্যকর থাকবে।
নির্বাচনকালীন এসব এলাকার হোটেলে যাতে বাইরের জেলার কেউ উঠতে না পারেন, সেদিকে নজর রাখতে হোটেল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপ নির্বাচনী অনিয়ম রোধে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথম দফার ভোটের বিস্তারিত
২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে। এই জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান ও বীরভূম জেলা। উল্লেখ্য, দীঘা পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত, যা এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে, এবং অমিত শাহের বাবরি মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব নাকচ করার ঘোষণা রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। ভোটাররা এখন অপেক্ষায় রয়েছেন যে এই প্রচারাভিযান ও হুঁশিয়ারিগুলো নির্বাচনের ফলাফলে কী প্রভাব ফেলবে।



