চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য: ২০০ সক্রিয় গ্যাং, ৬৪ 'বড় ভাই'র পৃষ্ঠপোষকতা
চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, ২০০ সক্রিয় গ্যাং

চট্টগ্রাম নগরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য: উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

চট্টগ্রাম নগরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। বয়সে কিশোর হলেও তারা খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে সংঘবদ্ধ সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। নগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া, আধিপত্য বিস্তার এবং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

সিএমপির জরিপে ভয়াবহ চিত্র

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) এক জরিপে দেখা গেছে, নগরীতে সক্রিয় প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। গত ছয় বছরে সংঘটিত অন্তত ৫৪৮টি অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ৬৪ জন ‘বড় ভাই’ বা প্রভাবশালীর পৃষ্ঠপোষকতার তথ্যও উঠে এসেছে। তুচ্ছ বিরোধ থেকেও প্রাণঘাতী সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা।

কিশোর গ্যাংয়ের নির্মম হামলার উদাহরণ

গত বছরের ১৬ মে জুমার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর কলেজছাত্র ওয়াহিদুল আলম সাব্বিরকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে সমবয়সী কিশোর গ্যাং সদস্যরা। এর আগে ২০২৪ সালের ১ জুন বোয়ালখালীতে সামান্য কথা কাটাকাটির জেরে খুন হয় স্কুলছাত্র আরিফ হোসেন। তাকে হত্যা করে তারই বন্ধু ১৪ বছর বয়সি এক কিশোর। ২০১৮ সালে নগরীর কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনানও কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০২৪ সালের ৫ এপ্রিল আকবর শাহ থানার ফিরোজশাহ কলোনি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় গুরুতর আহত হন দন্তচিকিত্সক কোরবান আলী ও তার ছেলে আলী রেজা। মাথায় ইটের আঘাতে গুরুতর আহত কোরবান আলী আইসিইউতে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয় এলাকাসমূহ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, গণি বেকারি, চট্টগ্রাম কলেজ এলাকা, চমেক হোস্টেল এলাকা, ওআর নিজাম রোড আবাসিক এলাকা, সিআরবি, খুলশি, ফয়’স লেক, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ, হালিশহর, বন্দর ও পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের তত্পরতা বাড়ে। তারা মোটরসাইকেল ও সাইকেলসহ পথচারীদের সর্বস্ব ছিনতাই, মাদক বিক্রির মতো সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।

পুলিশের অভিযান ও গ্রেফতার

কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নেই। সম্প্রতি র্যাব কিশোর গ্যাং লিডার ইমতিয়াজ সুলতান ইকরামকে গ্রেফতার করেছে। সে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী এবং স্কুলছাত্রী তাসফিয়া হত্যা মামলার আসামি। ১১ মার্চ মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ ৪৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ৯ জন কিশোর গ্যাং সদস্য রয়েছে।

এর আগে আনোয়ারায় অভিযান চালিয়ে ‘সম্রাট গ্রুপ’-এর প্রধানসহ তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় ধস্তাধস্তিতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। এছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ও ফেনী এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ছয়টি কিশোর গ্যাংয়ের ২৮ সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও নারীদের উত্ত্যক্তসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিল। গত বছরের সেপ্টেম্বরে হামজারবাগ ও মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ‘এমবিএস (মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট)’ নামে একটি কিশোর গ্যাংয়ের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বয়স ছিল ১৬ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।

পৃষ্ঠপোষকতা ও সামাজিক কারণ

পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, কিশোর গ্যাংগুলোর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক পরিচয়ে ‘বড় ভাইদের’ পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। তাদের ছত্রছায়ায় এসব কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এবং আইন প্রয়োগে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নজরদারির অভাব, মাদকাসক্তি, সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।

পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ কৌশল

সিএমপির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাং ও তাদের মদতদাতাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে চাঁদাবাজি, মাদক, জুয়া, কিশোর গ্যাং ও মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন নগর পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। তিনি বলেন, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।

তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, বিচ্ছিন্ন অভিযান কিশোর গ্যাং দমনে স্থায়ী সমাধান দিচ্ছে না। সংগঠিত এই অপরাধচক্র নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল না নিলে পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিশোর গ্যাং দমনে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক সচেতনতা, পরিবারের ভূমিকা এবং শিক্ষার প্রসারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।