সিলেটের শান্তিময় পরিবেশ আজ অপরাধীদের দখলে
সিলেটের আধ্যাত্মিক ও শান্তিময় পরিবেশ আজ ছিনতাইকারী ও অপরাধী চক্রের কাছে সম্পূর্ণভাবে জিম্মি হয়ে পড়েছে। গত শনিবার বিকেলে এক কলেজশিক্ষক তাঁর তিন বছরের শিশুকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে অটোরিকশায় যে ভয়াবহ ছিনতাইয়ের শিকার হলেন, তা শুধু একটি সাধারণ অপরাধ নয়; বরং চরম অমানবিকতার প্রকাশ। শিশুর গলায় ছুরি ধরে পিতাকে সর্বস্বান্ত করার এই মর্মান্তিক ঘটনা সিলেটের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্রই তুলে ধরছে।
ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট নগরে ছিনতাইয়ের ঘটনা যে হারে বেড়েছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনা থেকে এই বৃদ্ধির চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কখনো অটোরিকশার গতিরোধ করে নারীর ব্যাগ ছিনতাই, কখনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিক্ষার্থীকে আঘাত—এসব ঘটনা এখন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই ভয়াবহ পরিস্থিতির বিপরীতে সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে যে ধরনের বক্তব্য আসছে, তা সাধারণ মানুষের জন্য রীতিমতো হতাশাজনক।
পুলিশের বক্তব্য ও বাস্তবতার পার্থক্য
পুলিশ কমিশনারের দাবি অনুযায়ী, এসব ঘটনা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ এবং আগের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, যখন সাধারণ মানুষ নগরের রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে আতঙ্কিত থাকে, তখন শুধুমাত্র সূচক বা পরিসংখ্যান দিয়ে সেই আতঙ্ক কি দূর করা সম্ভব? পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী শত শত চোর-ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার হলেও জনমনে স্বস্তি ফিরছে না কেন? ২৬৩ জন ছিনতাইকারীর তালিকা করে মাত্র ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা কি পুলিশের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়?
বাকি অপরাধীরা কি তবে প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছিনতাইকারীরা গ্রেপ্তার হলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে আবার একই অপরাধে জড়াচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অনেকেই ঝামেলার ভয়ে থানায় অভিযোগ করতে চান না, যার ফলে অনেক ঘটনাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের উদ্বেগ
সিলেটের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং নাগরিক আন্দোলনের প্রতিনিধিরা পুলিশকে আরও তৎপর হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিষয়টিকে যখন ‘নেতিবাচক প্রচার’ বা ‘ব্যক্তিগত বিরোধ’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন অপরাধীরা আরও প্রশ্রয় পায়। অপরাধকে আড়াল করার এই সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত অপরাধীকেই সুরক্ষা দেয়।
সমাধানের পথ ও আশার কথা
আমরা আশা করব, সিলেট মহানগর পুলিশ সমস্যাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে সে অনুসারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সচেষ্ট হবে। অটোরিকশা বা জনাকীর্ণ মোড়গুলোয় পুলিশের নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে অটোরিকশায় যাত্রীবেশে ছিনতাই ঠেকানোর জন্য চালক ও যাত্রীদের পরিচয় যাচাইয়ের বিশেষ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। বিচ্ছিন্ন ঘটনার দোহাই দিয়ে দায় এড়ানোর সময় এখন পার হয়ে গেছে। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর না হয়, তবে সিলেটের শান্তিময় পরিবেশ অচিরেই অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।
সিলেটের সাধারণ মানুষ এখন নিরাপত্তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। পুলিশ ও প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপই পারে এই অপরাধ প্রবণতা রোধ করতে এবং নগরকে আবারও শান্তিময় করে তুলতে।



