সাত সেকেন্ডের অস্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ মুছাব্বির হত্যার তদন্তে চাবিকাঠি
রাজধানী ঢাকার তেজতুরী বাজার এলাকায় গত ৭ জানুয়ারি রাত ৮টা ২০ মিনিটের দিকে এক নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। আহছানউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তরের স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্যসচিব আজিজুর রহমান মুছাব্বির। তাঁর সঙ্গে থাকা সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদও গুলিবিদ্ধ হন, যখন তিনি মুছাব্বিরকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। ঘটনাস্থলে হামলাকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়, leaving behind a scene of chaos and confusion.
তদন্তের সূচনা: অস্পষ্ট সিসি ক্যামেরা ফুটেজ
গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্তে নেমে প্রথমে আশপাশের ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ ঘেঁটে কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীরাও স্পষ্ট বর্ণনা দিতে পারেননি। তবে, একটি মাত্র সাত সেকেন্ডের অস্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই ফুটেজে দেখা যায়, ডাস্টবিনের আড়াল থেকে এক ব্যক্তি উঁকি দিচ্ছেন, তাঁর কানে মুঠোফোন ধরা। এই সংক্ষিপ্ত দৃশ্যটিই পরবর্তীতে পুরো হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে সহায়তা করে।
প্রযুক্তি ও বিশ্লেষণের সমন্বয়ে সাফল্য
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, "একটি অস্পষ্ট ফুটেজ থেকে হত্যার সূত্র বের করা প্রথমে অত্যন্ত কঠিন মনে হচ্ছিল। তবে ধারাবাহিক বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার—এই দুইয়ের সমন্বয়ে সেই কঠিন কাজ সম্ভব হয়েছে।" তদন্তকারীরা ফুটেজটি আলাদা করে বিশ্লেষণ শুরু করেন এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের তথ্য ব্যবহার করে ওই সাত সেকেন্ডের সময়ে গলি ও আশপাশ এলাকায় সক্রিয় ফোন নম্বরগুলির একটি দীর্ঘ তালিকা তৈরি করেন।
এই তালিকা থেকে একটি সন্দেহজনক নম্বর শনাক্ত করা হয়, যা তদন্তকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীদের দিকে নিয়ে যায়। দেখা যায়, ওই নম্বর থেকে যাকে ফোন করা হচ্ছিল, তাঁর অবস্থানও একই গলিতে ছিল। অবস্থান শনাক্ত করে ডিবি তিনজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে, যারা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে ভেঙে পড়ে এবং হত্যার দায় স্বীকার করে।
গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তি
ডিবি সূত্র অনুযায়ী, ফুটেজে দেখা ব্যক্তির নাম বিল্লাল, যিনি মুঠোফোনে তাঁর ভাই আবদুর রহিমকে মুছাব্বিরের অবস্থান জানান। গলির ভেতরে আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন রহিম ও তাঁর সহযোগী জিন্নাত, যারা মুছাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত বিল্লাল, আবদুর রহিম ও জিন্নাত ছাড়াও আবদুল কাদির ও মো. রিয়াজ নামের আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যারা পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে বিল্লাল, আবদুর রহিম ও আবদুল কাদির আপন তিন ভাই।
গ্রেপ্তারের পর জিন্নাত আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন, যাতে তিনি উল্লেখ করেন যে বিল্লাল হত্যার পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও অস্ত্রের জোগানদাতা ছিলেন। হত্যার পর শুটাররা মহাখালীর একটি মাঠে অস্ত্র জমা দিয়ে ঘটনার নির্দেশদাতা জাহিদুলকে ফোনে জানায়।
হত্যার পেছনের পরিকল্পনা ও বিদেশি সংযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে দেশের বাইরে থাকা এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। কারওয়ান বাজার ও আশপাশ এলাকার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সাড়ে চার মাস আগে এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ওই সন্ত্রাসীর নির্দেশে দায়িত্ব পান বিল্লাল ও জাহিদুল, পরে যুক্ত হন অন্যরা।
এর আগেও একবার মুছাব্বিরকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানা গেছে, এবং কয়েক দিন ধরে তাঁর গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হয়। প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হলে পরিকল্পনা বদলে জিন্নাত ও আবদুর রহিমকে শুটার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, হত্যার পর জিন্নাত তিন থেকে চার লাখ টাকা ও একটি মোটরসাইকেল পাবেন, আর বিল্লালকে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি মামলার খরচ বহনের আশ্বাস দেওয়া হয়।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম বলেন, "ডিবির সমন্বিত প্রচেষ্টায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা গেছে, একই সঙ্গে উদ্ঘাটিত হয়েছে পুরো ঘটনার রহস্য।" এই তদন্ত প্রক্রিয়া প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা কৌশলের কার্যকর সমন্বয়ের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।



