সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নিল ডিবি
মানব পাচার মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার

মানব পাচার মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার

সোমবার মধ্যরাতে ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএসের বাসা থেকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে পল্টন থানার মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

মামলার পটভূমি ও সিআইডির ভূমিকা

২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আফিয়া ওভারসিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক আলতাব খান মানব পাচার আইনে ঢাকার পল্টন থানায় ১০৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এ মামলার ৩ নম্বর আসামি। মামলাটি তদন্ত করে সিআইডি গত বছরের ১৫ জুলাই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে মামলাটিকে মিথ্যা উল্লেখ করে।

বাদী আলতাব খান প্রথম আলোকে বলেন, আসামিদের সঙ্গে সমঝোতা করে সিআইডি মামলাটিকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করেছে। মামলার ফলাফল তাঁকে জানানো হয়নি এবং তিনি মিথ্যা মামলা করেছেন উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও সুপারিশ করেছে সিআইডি। পরে তিনি বিষয়টি জানতে পেরে আদালতে না রাজি দেন। আদালত মামলাটি পুনঃ তদন্তের জন্য ডিবিকে নির্দেশ দেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডিবির তদন্ত ও নতুন গতি

মামলাটি ডিবিতে আসার পরও তেমন গতি পায়নি। তবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করায় এ মামলা নতুন করে গতি পেয়েছে বলে বাদী মনে করেন। ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিগত সরকারের সময়ে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি চক্র গড়ে তোলা হয়েছিল, যেখানে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী একজন ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ছিলেন। সেই চক্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ক্ষমতার উৎস সম্পর্কেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত বছরের ডিসেম্বরে এ মামলার ১২ নম্বর আসামি এস এম রফিক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ডিবির একজন কর্মকর্তা জানান, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির নামে মানব পাচার ও বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে, সে তথ্য-উপাত্ত উঠে এসেছে।

এক-এগারোর সময়ের বিতর্কিত ভূমিকা

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। মানব পাচার মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলেও এক-এগারোর সময়ে বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়েও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির দিন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সঙ্গে বঙ্গভবনে যাওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীও ছিলেন। তিনি সেদিন বঙ্গভবনে সশস্ত্র অবস্থায় গিয়ে চাপ প্রয়োগ করেন, যার ফলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন।

জরুরি অবস্থা জারির পর মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির (টাস্কফোর্স) সমন্বয়ক হন। এই পদ ছিল সে সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রশাসনিক অভিযান সমন্বয়-কাঠামোর একটি। তিনি পরে পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন।

মামলার অন্যান্য আসামি

মামলার নথি অনুযায়ী, ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারী, সাবেক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন এবং ঢাকা–২০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদও এ মামলার আসামি।

সিআইডিতে মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাঁরা যখন মামলার তদন্তভার পান, তখন ১০৩ জন আসামির মধ্যে ৭৬ জন জামিনে ছিলেন এবং অন্যরা পলাতক ছিলেন। ফলে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি এবং বাদী যথেষ্ট তথ্য–প্রমাণ হাজির করতে পারেননি।

এখন আদালতের নির্দেশে মামলাটি পুনঃ তদন্ত করছে ডিবি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তারা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।