কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু, দুই গেটম্যানের বিরুদ্ধে মামলা
কুমিল্লার পদুয়া বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় বাসের ১২ যাত্রী নিহতের মর্মান্তিক ঘটনায় দুই গেটম্যানকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত প্রবাসী সোহেল রানার খালা শেফালী আক্তার (৫৮) বাদী হয়ে সোমবার দুপুরে কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে থানায় এই মামলা করেন।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
ঈদের পরের দিন রোববার ভোররাত ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় মামুন স্পেশাল পরিবহণের একটি বাসকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেন ধাক্কা দেয়। এতে ৭ জন পুরুষ, ২ নারী ও ৩ শিশুসহ মোট ১২ জন প্রাণ হারান এবং অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হন।
বাদী শেফালী আক্তার তার এজাহারে উল্লেখ করেন, নিহত সোহেল রানা (৪৬) তার বোনের ছেলে এবং মালয়েশিয়া প্রবাসী ছিলেন। তিনি গত ১৫ রমজানে বাংলাদেশে ছুটিতে আসেন। ঈদের দিন সন্ধ্যা ৬টা ৪২ মিনিটে ঝিনাইদহের খালিশপুর বাস কাউন্টার থেকে মামুন স্পেশাল পরিবহণের বাসে করে সোহেল রানা তার স্ত্রী ও সন্তানসহ লাকসামে বেড়াতে রওনা দেন।
মামলার আসামি ও কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ
মামলায় রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত গেটম্যান মো. হেলাল (৪১) ও মেহেদী হাসান (৩৩)-কে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া রেলক্রসিংয়ের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অজ্ঞাতনামা হিসেবে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে উভয় আসামি আত্মগোপনে রয়েছেন।
লাকসাম রেলওয়ে থানার ওসি জসীম উদ্দিন খন্দকার জানান, "পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। আমরা এজাহার পেয়েছি। এতে ওই লেভেল ক্রসিংয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী হেলাল ও মেহেদী হাসানকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে তারা পলাতক রয়েছে। আমরা তাদেরকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।"
দুর্ঘটনার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে হেলাল ও মেহেদী হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে এবং তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, রেলক্রসিংয়ে গেটম্যানের দায়িত্বহীনতায় এ ঘটনা ঘটেছে।
আসামিদের পরিচয় ও দুর্ঘটনার ভয়াবহতা
প্রধান আসামি মো. হেলাল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কোদালিয়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে। তিনি পদুয়া বাজারের রেলওয়ে ওভারপাসের নিচে থাকা রেলগেট নম্বর ই/৪৭-এর অস্থায়ী গেটম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অন্য আসামি মেহেদী হাসান বুড়িচং উপজেলার বাহিরীপাড়া এলাকার আবদুল কাদেরের ছেলে এবং ওই লেভেল ক্রসিংয়ে ওয়েম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
দুর্ঘটনার সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ঢাকা মেইল ওয়ান আপ ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে বাসটির ধাক্কা লাগার পর বাসটি ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে যায়। ট্রেনটি ইঞ্জিনের মুখে করে বাসটিকে টেনে-হিঁচড়ে প্রায় এক কিলোমিটার নিয়ে যায়, যা ঘটনার ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে তোলে।
বাদী শেফালী আক্তার লাকসাম উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের প্রয়াত আক্তারুজ্জামানের স্ত্রী। তার মামলায় পরিবারের সদস্য হারানোর বেদনা এবং ন্যায়বিচারের দাবি প্রতিফলিত হয়েছে। এই ঘটনা রেলপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটি এবং মানবিক ট্র্যাজেডির মর্মান্তিক দিকগুলো উন্মোচিত করেছে।



